ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
রাষ্ট্রের উন্নয়ন দুই ধরনের হতে পারে। একটি হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর অন্যটি হলো মানবিক উন্নয়ন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথে আমরা খুব দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি। এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে দালানকোঠা নির্মাণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিকাশ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্নমুখী উন্নয়ন। এ ধরনের উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করলেও মানবিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে না। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী বা সাস্টেনেবল করার জন্য মানবিক উন্নয়নকে কখনো উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যেমন অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মানবিক উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কোমলমতি শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের বিষয়টি আমাদের খুব বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯টি শিশু। এদের মধ্যে ১৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একটু পেছনের দিকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে দেখা যায় সে বছর ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এদের মধ্যে ২২টি শিশু মারা যায়। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোর যে বিভিন্ন উপাদান রয়েছে তা একজন শিশুকে প্রভাবিত করে তার আচরণ পরিবর্তনে সক্ষম নয়। সেখানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়নেরও কোনো রূপরেখা নেই। আবার একটি স্তর থেকে শিশুরা যখন লেখাপড়ার আরেকটি স্তরে পৌঁছাচ্ছে তখন বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যে ধারাবাহিকতা থাকা দরকার সেটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জাপান, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর সেরা শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের প্রাথমিক স্তরে বইয়ের পরিবর্তে জীবনাচরণের বাস্তব বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশকে প্রভাবিত করে মানবিক উন্নয়নের বিভিন্ন উপাদানসমূহ হাতে কলমে শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের প্রথম স্তর থেকেই বোঝানো হয় যারা তার সঙ্গে পড়ছে তারা তার বন্ধু নয় বরং তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এই ধরনের মানসিকতা নিয়ে একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সকল মানুষকে তার বিপক্ষ শক্তি বলে ধারণা করছে। এর ফলে মানুষের প্রতি সে মানবিক না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে দানবিক হয়ে উঠছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে মানুষের মধ্যে অনেক সময় বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। আর বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যদি নৈতিকতা না থাকে তবে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রীক উন্নয়নের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এর ফলে মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা ও লোভ সৃষ্টি হয়। যার প্রভাবে মানুষ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে গিয়ে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক, ভোগবিলাসিতা, জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন নেতিবাচক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। মানুষ যখন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে থাকে তখন তার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ হাতে আসে। অপরাধ বিজ্ঞান বলছে, চাহিদার চেয়ে মানুষের কাছে বেশি অর্থ থাকলে মানুষ সে অর্থ ব্যবহার করার মতো কোনো জায়গা খুঁজে পায় না। এই অতিরিক্ত অর্থ মানুষের মনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে না। এর কারণ হচ্ছে এই অর্থ সততার মাধ্যমে অর্জিত নয়। ফলে বিষয়টি মানুষের মনোজগতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এর ফলে এই অতিরিক্ত অর্থ ভালো কাজে ব্যবহূত না হয়ে ভোগ বিলাসিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক ও অবৈধ কাজে ব্যবহূত হয়। বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল উপাদান হলো—অর্থ, অর্থের প্রতি লোভ, লালসা, স্বার্থ, সচ্ছলতা ও বিলাসিতা। এই ধরনের নেতিবাচক উপাদানসমূহ অর্জন করার জন্য মানুষ তার মানবিক স্তরে দুর্বৃত্তপনা, হীনমন্যতা, পেশিশক্তি, পাশবিকতা, রক্ষণশীলতা ও অনৈতিকতাকে লালন করছে। অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অর্থের স্থান গৌণ। সেখানে অর্থের চেয়ে মানবতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, পরস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, সততা, নৈতিকতা ও অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মতো বিষয়গুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোনো ধরনের উন্নয়ন মানবিক উন্নয়ন ছাড়া মূল্যহীন। মানবিক উন্নয়নকে উপেক্ষা করে কেবলমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রাধান্য দিলে সমাজে অস্থিরতা, হানাহানি, বৈষম্য, বিভেদ, বিশৃঙ্খলা ও অনাচার বাড়তে থাকে।
n লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর