ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার
জামিউল আহসান সিপু
‘আমারে বাঁচান। যাত্রী আমারে ছুরি মারছে। ছিনতাইকারী আমারে ছুরি মারছে। আমার মোটরসাইকেল নিয়া গ্যাছে’। এটাই ছিল গত ২৬ আগস্ট রাত ৩টার দিকে রাজধানীর মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত পাঠাও চালক পলাশের শেষ কথা। এরপরই টহল পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে তিনি মারা যান। পরে পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে পলাশের ছিনতাই করা মোটরসাইকেলসহ ছিনতাইকারী মিলনকে গ্রেফতার করে। এ ব্যাপারে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন বলেন, ফ্লাইওভারের ওপর অন্ধকার স্থান হওয়ায় ছিনতাইকারীরা ওই স্থানটি বেছে নেয়। ঘটনাটি রাতের নির্জনে হওয়ায় এমন ক্লুলেস ঘটনায় অপরাধীকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করাটা ছিল পুলিশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।
মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভারে অন্ধকারের মধ্যে হত্যা ও ছিনতাইয়ের ঘটনার পর পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ডিএমপি সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, রাতে মগবাজার, রামপুরা থেকে মালিবাগ হয়ে মতিঝিল এলাকা অতিক্রম করা ফ্লাইওভারে ল্যামপোস্টের কোনো লাইট জ্বলে না। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই গাড়ি চলে। এ কারণে পুলিশের গাড়িও ঠিকমতো টহলে থাকে না। কারণ অন্ধকারে পুলিশের গাড়ি ফ্লাইওভারের ওপরে থামলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে বলে মনে করে পুলিশ। সম্প্রতি কথিত জঙ্গি গোষ্ঠী পুলিশকে টার্গেট করায় ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের টহল কমে গেছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর ল্যাম্পপোস্টের বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়ার তার (ক্যাবল) চোর চুরি করে নিয়ে গেছে। ফলে ইন্টার কানেকশন সিস্টেম সম্পূর্ণ অকেজো। এ অবস্থায় ফ্লাইওভারে লাইটিংয়ের জন্য ৩০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রজেক্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি অন্ধকারের মধ্যে বেশ কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ৯ কিলোমিটারের ফ্লাইওভারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর ল্যাম্পপোস্টে অস্থায়ীভাবে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে সচল করা হবে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা বর্ণনা করে ডিএমপি সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এক রাতে রামপুরার আবুল হোটেলের সামনে এক পথচারী দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ওই সময় দ্রুত গতিতে ওই পথ দিয়ে এসে একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী তার মোবাইল ফোনটি হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সামনের ফ্লাইওভারের দিকে এগুতে থাকে। ওই সময় ফ্লাইওভারের মুখেই ছিল কয়েক জন টহল পুলিশ। মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া লোকটির চিত্কারে পুলিশ কাছে থাকা রাইফেলের বাট দিয়ে দ্রুত গতিতে ফ্লাইওভারে ওঠা মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীদের আঘাত করেও থামাতে পারেনি। এর আগে বাংলামোটর থেকে মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। কিছু দূর এগোনোর পর দেখতে পান সামনে একটি গাড়ি আড়াআড়ি করে রাখা। প্রাইভেট কারের গতি কমিয়ে তিনি হর্ন বাজাতে থাকেন। সাড়া-শব্দ না পেয়ে একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নামতেই পড়ে যান ভয়াবহ বিপদের মুখে। আড়াআড়ি করে রাখা গাড়ি থেকে নেমে তিন অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে ফেলে। এরপর অস্ত্রের মুখে বেধড়ক পিটিয়ে তার কাছ থেকে গাড়ির চাবি কেড়ে নেয় তারা। এরপর গাড়িটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। আহত সাইফুল ইসলামকে পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এর আগে গত বছরের ২৮ মে ফ্লাইওভারের মালিবাগের অংশ থেকে বস্তাবন্দি এক নারীর দুই হাত ও দুই পা উদ্ধার করে রমনা থানা পুলিশ। একটি গাড়ি থেকে ওই ব্যাগটি ফেলে দেওয়া হয়।
ফ্লাইওভারের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুঁটির গোড়া থেকে বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে গেছে চোররা। এ কারণে ল্যাম্পপোস্টের লাইট জ্বলে না। সেই সঙ্গে ফ্লাইওভারে নজরদারি রাখতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও আলো না থাকায় রাতে সেগুলো এক রকম অকেজো হয়ে পড়ে। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথাও নেই।