চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে ব্যাংক আমানতের সুদ কমে গেছে। আবার শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেও খুব বেশি ভরসা পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এ বাজারের সূচক একদিন বাড়ে তো পরের দিন কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগই এখন মানুষ নিরাপদ মনে করছেন। ফলে ব্যাপকভাবে বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) প্রথম চার মাসেই পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ শতাংশ বিক্রি হয়ে গেছে।
ব্যাংকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা মিলছে সঞ্চয়পত্রে। এজন্য অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বেশি সুদ পাওয়া যায় এতে বিনিয়োগ করছেন তারা। বিক্রির মাত্রা বেড়ে যাওয়া পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের সংকট দেখা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে পাওয়া গেলেও অন্যান্য ব্যাংকে সঞ্চয়পত্রের সংকট দেখা দিয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে সঞ্চয়পত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ এসেছে। এ চার মাসে সঞ্চয়পত্রে মোট জমা হয়েছে ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। যা মোট পুরো বছরের মোট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ শতাংশ। সরকার চলতি অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল। গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫১৪ কোটি টাকা বেশি বিক্রি হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। যা ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (সংশোধিত) থেকেও দুই হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে জাতীয় সঞ্চয়স্কিমসহ সব ধরনের সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই সরকার ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সঞ্চয়পত্রের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে মোট ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা নেয় সরকার। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার ঋণ নেয় ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত অক্টোবর পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
এদিকে সঞ্চয়পত্রে জনসাধারণের বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ার ফলে মুদ্রা বাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করে মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির মতে, সুদহার বেশি হওয়ায় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশই আসছে এ খাত থেকে। এতে বাজারে সুদহার কমানো যেমন সহজ হচ্ছে না, তেমনি সরকারের বেশি সুদবাহী দায় বাড়ছে। অন্যদিকে বন্ড মার্কেট উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমছে, যা সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিল বিক্রি করে বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিকীকরণে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে।
সঞ্চয়পত্রে সুদের হার পুনর্নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ ও ব্যাংক পরিচালকসহ বিভিন্ন মহলের চাপ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে বহুল আলোচিত সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মে’র পর থেকে এ হার কার্যকর আছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।
উল্লেখ্য, এখন সঞ্চয়পত্র ভাঙানো ও মুনাফা সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্রের টাকার জন্য বই জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। মাস শেষে মুনাফার টাকা ও মেয়াদ শেষে আসল টাকা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। আর টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইল শর্ট ম্যাসেজ সার্ভিস (এসএমএস) ও ইমেইল করে জানিয়ে দেওয়া হয়। সময়, অর্থের সাশ্রয় ও ভোগান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) নামে গত বছর সফ্টওয়্যার চালু করে। এ সফট্ওয়ারের মাধ্যমেই গ্রাহকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন।