ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দফায় দফায় হারছেন বরিস

বিশ্বের ‘মাদার অব পার্লামেন্টস’ হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনের পার্লামেন্টে দফায় দফায় হারছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। দুই দিনে তিনটি ভোটেই হেরেছেন তিনি। যে পার্লামেন্টকে নিষ্ক্রিয় করে নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, তার সঙ্গে একের পর এক সংঘাতে হেরে যাচ্ছেন তিনি। বিরোধীসহ নিজ দলের অনেক এমপির তোপের মুখে পড়েছেন। নিজের ভাই জো জনসন মন্ত্রী ও এমপি উভয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। মার্কিন মিডিয়া সিএনএন বলছে, ‘মাদার অব পার্লামেন্টস’ এখন ‘মাদার অব অল ব্যাটেলস’ এ রূপান্তরিত হয়েছে। আগামী সোমবার প্রধানমন্ত্রী বরিসের আগাম নির্বাচনের ওপর ফের ভোট দিতে পারবেন এমপিরা। তবে সেদিনও বরিস হারবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি ও ডয়চেভেলের

দফায় দফায় হারে বিধ্বস্ত বরিস

প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বুধবার রাতে হাউজ অব কমন্সে দুই দফা পরাজিত হয়েছেন। আগাম নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব এনেছিলেন সেটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় খারিজ হয়েছে। আগাম নির্বাচনে প্রস্তাবের পক্ষে ২৯৮ ও বিপক্ষে পড়ে ৫৬ ভোট। দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে আরো ১৩৬টি ভোট দরকার ছিল বরিসের। এর আগে এমপিরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে চুক্তি ছাড়া বেরিয়ে যাবার বিষয়টি আটকে দিয়ে বিল (৩২৯-৩০০) পাশ করে। মঙ্গলবার পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ নেন এমপিরা। এই বিল পাশ হয় ৩২৮-৩০১ ভোটে। বিলগুলো আনে বিরোধী দল। তাদের সঙ্গে যোগ দেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির একদল বিদ্রোহী এমপি।

আগামী কয়েক দিনেও বরিসকে তার ঘোষিত নীতির পথ থেকে সরে আসতে হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ইইউর শীর্ষ সম্মেলনে ব্রেক্সিট সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জনসনের সরকার হয় তার আগে ইইউর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে সক্ষম হবে, অথবা ৩১ অক্টোবর ব্রিটেন চুক্তি ছাড়াই ইইউ ত্যাগ করবে। এই শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করেই ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী পক্ষ ও সরকার পক্ষের কয়েকজন বিদ্রোহী এমপি তাদের রণকৌশল স্থির করেছেন। বুধবার তারা চুক্তিহীন ব্রেক্সিট এড়াতে পার্লামেন্টে প্রস্তাব অনুমোদনে সক্ষম হওয়ায় ১৯ অক্টোবরের মধ্যে ইইউর সঙ্গে সমঝোতা না হলে সরকারকে ব্রেক্সিটের মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়ানোর আবেদন করতে হবে।

নিম্ন কক্ষ হাউজ অব কমন্সের পর উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসেরও সম্মতি প্রয়োজন। এরপর রানি সাক্ষর করলে প্রস্তাব আইন হিসেবে কার্যকর হবে। কিন্তু হাউস অফ লর্ডস এর মধ্যেই ৯০টি সংশোধনীসহ প্রস্তাবটি আবার হাউজ অফ কমন্সে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ায় গোটা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটতে পারে। সবকিছু ঠিকমতো চললে আগামী সোমবার এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে পারে। বর্তমান অবস্থায় বিরোধীরা বরিসের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ তিনি নির্বাচনে জিতলে যে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট থেকে সরে আসবেন সেই নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতিবিদসহ বিরোধীদের আশংকা চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী জনসন বিরোধীদের অবস্থানের তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, তার ব্রেক্সিট সংক্রান্ত পরিকল্পনা বাতিল করে পার্লামেন্ট কার্যত ব্রাসেলসের সঙ্গে দরকষাকষির পথ বন্ধ করে ইইউর হাতে ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে। কিন্তু কেবল বিরোধীরা নয়, নিজের ভাই জো জনসনও বরিসের বিপক্ষে গেছেন। ব্যবসায় মন্ত্রী এবং এমপি পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করে বলেছেন, দেশের স্বার্থেই পদত্যাগ করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জো জনসনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জো জনসন আগে থেকেই ইইউতে থাকার পক্ষে।

‘মাদার অব পার্লামেন্টস’ এখন যুদ্ধক্ষেত্র!

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের পার্লামেন্ট বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত। এটাকে বলা হয়, বিশ্বের সব পার্লামেন্টের মা। কিন্তু গত দুই দিনে এটি ‘মাদার অব অল ব্যাটেলস’ (সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্র) এ পরিণত হয়েছে। মঙ্গল ও বুধবার এমপিরা যেভাবে বিতর্ক করেছেন তা ঐতিহাসিক। এই ধরনের বিতর্ক অতীতে হয়েছে কিনা সেটা বলা দুষ্কর। নিজ দলের ২১ এমপিকে বরখাস্ত করেও হার ঠেকাতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী বরিস। বরং তার সব পরিকল্পনাই আটকে দিয়েছেন এমপিরা। মঙ্গলবার রাতে ১৫ লাখ বিশ্ববাসী বিবিসি পার্লামেন্ট চ্যানেলে বিতর্ক সরাসরি দেখেছেন। তারা প্রত্যক্ষ করেছেন, কিভাবে সরকার পার্লামেন্টকে অবমাননা করেছেন এবং এমপিরা সরকারের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছেন। কোনো একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক চ্যানেলটি দেখেছেন। বরিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন কেনেথ ক্লার্ক যিনি দীর্ঘদিন ধরে এমপি হিসেবে আছেন। অনেক এমপির বয়সও তার এমপি হওয়ার বয়সের সমান নয়। তিনি বরিসের কপটতার নিন্দা করেছেন। বিদ্রোহ করেছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের নাতি নিকোলাস সোয়ামসও। তিনি পার্লামেন্টের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে একরকম চোখের পানি ফেলেছেন।

ব্রিটেনের সংবিধান লিখিত নয়। এটা বিভিন্ন রীতি-নীতি ও প্রথার মাধ্যমে চলে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এটা এখন প্রযোজ্য কিনা। লন্ডন ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর গভর্ণমেন্ট এর সিনিয়র ফেলো ক্যাথেরিন হ্যাড্ডন বলেন, এটা এখন ব্রিটেনে মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। বতর্মানে এমপিদের কাজের সঙ্গে অলিখিত সংবিধান সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারো কারো মতে, সংবিধান নিয়ে সমস্যা নয়, সমস্যা রাজনীতি নিয়ে। কারণ রাজনীতির সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্রের পতন ঘটছে।