কৃষিপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

কৃষি এখন আর আগের সেই মান্ধাতা আমলের মতো নেই। আগে যেমন সেচকার্যের জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওড় ইত্যাদি মুক্ত জলাশয়ের ওপরই নির্ভর করতে হতো সেদিন আর নেই। ছোটোবেলায় গ্রামে দেখা যেত—সবজি ক্ষেতে সেচ দেওয়ার জন্য পুকুর, ভাগাড়, খাল-বিল এসব স্থান থেকে কলসি দিয়ে দূর-দূরান্তে পানি বয়ে নিয়ে এসে জমিতে দেওয়া হতো। আবার কোনো কোনো এলাকায় জমির পাশেই কয়েক ফুট গর্ত করে একটি কূপ খনন করে সেখান থেকেই সেচের কাজ সারা হতো। তখন পানির স্তর এতটা ওপরে ছিল যে, মাত্র কয়েক ফুট গভীর গর্ত করলেই পানি উঠে পড়ত। তখন সেওতি, দোন, ঘটি-বাটি, কলসি, বোল ইত্যাদি দেশীয় সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে সেচে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু তার পরে এলো আরেকটু উন্নত হিসেবে পরিচিত পায়ে চালানোর প্যাডেল পাম্প, এরপর আস্তে আস্তে আসতে থাকে শ্যালো টিউবওয়েল, সরকারের বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিআরডিবি) ও বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি)’র মাধ্যমে ডিপ টিউবওয়েল—যেগুলো দিয়ে সেচের কাজ এখনো চলছে।

এত গেল সেচের কথা। ঠিক এমনিভাবে কৃষির অন্য সব কার্যক্রম অতি দ্রুততার সঙ্গে যান্ত্রিকীকরণ হতে থাকে কালের আবর্তনে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের আধুনিকীকরণ ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে জমা-জমি এত বেশি খণ্ড-বিখণ্ড ও টুকরো টুকরো যে, তাতে যান্ত্রিকীকরণ করা ছিল খুবই কঠিন কাজ। তাছাড়া আমাদের দেশের কৃষকদের কোনো উন্নয়ন ও নেতৃত্বদানকারী সংগঠন না থাকার কারণে তা আরো এক ডিগ্রি বেশি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আবার দেশের কৃষককূলের বেশির ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের এবং অল্প ও অশিক্ষিত। তাদের আর্থিক সঙ্গতি ও বোধগম্যতা খুবই কম। সেজন্য তাদের উন্নত ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিজেদের টাকায় কেনার সামর্থ্য নেই। তার পরও বাংলাদেশ আজ কৃষিক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, যার মূলে রয়েছে উত্তরোত্তর উন্নত, আধুনিক কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে।

যান্ত্রিকীকরণ শুধু একদিকে হলে তা কখনোই টেকসই হয় না। তাই তাকে টেকসই করতে হলে অবশ্যই এর বহুমাত্রিকতা থাকতে হয়। সেজন্য কৃষিতে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ব্যবহার এবং এগুলোর যান্ত্রিক প্রয়োগের মাধ্যমে একদিকে সময় বাঁচানো, অপরদিকে শ্রম ও উত্পাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত চাষাবাদের ঐতিহ্যগত হালের গরু দিয়ে চাষাবাদের পরিবর্তে পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা ছোটোবেলায় শুধু সরকারিভাবে আখচাষের জন্য ট্রাক্টর ব্যবহার করার সময় সেগুলোকে কলের লাঙল হিসেবে আখ্যায়িত করতাম। এখন ধান, গম ইত্যাদি ফসল মাঠ থেকে কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য প্যাডেল থ্রেসার, পাওয়ার থ্রেসার, সবগুলো কাজ একসঙ্গে করার জন্য আরো উন্নত যন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাঠের ফসল কেটে মাড়াই করে একেবারে শুকিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বস্তাবন্দি করে বের করা হয়ে থাকে।

এভাবে অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়ে এসডিজিসহ সব সূচকে দেশ এগিয়ে যাবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ; যেখানে পুষ্টিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। আর এমনটি করতে হলে কৃষিতে প্রযুক্তি নির্ভরতার বিকল্প নেই। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে এখন পরিবেশসম্মত কৃষি যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। কৃষিপণ্য হিসেবে ইলিশ মাছ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষিরশাপাতি আমকে জিআই পণ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে সরকার। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যেমন অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন ছাড়া কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি এখন তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও তাই করে চলেছেন।

কাজেই আগামী দিনে এ দেশের সরকার, কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি প্রযুক্তিবিদ, কৃষি পরিকল্পনাবিদ সমন্বয়ে কৃষি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং এগিয়ে যাবে দেশ।

n লেখক :কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়