বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু উত্সব
ইত্তেফাক রিপোর্ট
চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া বিলুপ্তির কিনার থেকে উঠে আসা সব নকশা। এত পাতলা জমিনে এত সূক্ষ্ম কাজ কীভাবে যে তাঁতে বুনেছেন শিল্পীরা সে এক বিস্ময়! যেন এ কোনো জামদানি নয়, তাঁতে লেখা কবিতা। প্রায় দুই বছর ধরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিরলস কাজের ফসল নিয়ে শুরু হয় জামদানি উত্সব।
জামদানি বাংলার এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এর নকশার ছন্দে, রঙের বিন্যাসে যেন ফুটে ওঠে তাঁতে লেখা কবিতা। জামদানি পৃথিবীর বয়নশিল্পের ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। জামদানির সেই ঐতিহ্য, আভিজাত্য তুলে আনতে হারিয়ে যেতে বসা জামদানির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে রাজধানীতে শুরু হয়েছে জামদানি উত্সব। বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শীর্ষক জামদানি উত্সব। এ প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে মুসলিম বয়ন শিল্পীরা যে অনন্য সাধারণ শিল্পধারা সৃষ্টি করেছিলেন বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরাও অপরিসীম দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে বুনেছেন জামদানি। যেসব ডিজাইন হারিয়ে যেতে বসেছিল, গবেষকদের খুঁজে আনা সেসব ডিজাইন অনায়াসে উঠে এসেছে এখনকার বয়নশিল্পীদের তাঁতে।
প্রদর্শনীতে হারিয়ে যাওয়া বিলুপ্ত প্রায় আদি জামদানির ডিজাইনের অনুসরণে এখনকার জামদানির বয়নশিল্পীরা বয়ন করেছেন। সেখান থেকে ৩০টি শাড়ি উপস্থাপন করা হয়েছে প্রদর্শনীতে। এর পাশাপাশি জামদানির নকশা, পুরোনো জামদানিও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। গবেষকদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই আদি জামদানি নতুন করে বয়নের প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে আড়ং, কুমদিনী, অরণ্য ও টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির।
গতকাল শুক্রবার বিকালে এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী এবং ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিল এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়নের প্রেসিডেন্ট ড. গাদা হিজাউয়ি-কাদুমি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে গত দুই বছরের কাজের গতি-প্রকৃতি তুলে ধরেন ডিজাইনার চন্দ্র শেখর দে। সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।
ডা. দীপু মনি বলেন, জামদানি শাড়িগুলোর বুননে মিশে রয়েছে এই বাংলার বয়নশিল্পীদের গৌরবগাথা। মিশে রয়েছে তাদের জীবনের গল্প। একেকটি শাড়ি যেন একেকটি জীবনের কাহিনী। এই জামদানির চাহিদা ছিল মোগল রাজদরবারে, ব্রিটিশ রাজপরিবারে। সেই চাহিদার ছাপ রয়েছে জামদানির ডিজাইনে। হারিয়ে যেতে বসা সেই জামদানি আবার ফিরে আসছে গৌরবের পথ ধরে।
চন্দ্র শেখর দে বলেন, জামদানির গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধ রচনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ প্রায় দুই বছর ধরে দেশে ও দেশের বাইরের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের সংগ্রাহক এবং বিভিন্ন জাদুঘরের সহযোগিতায় ১৫০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির ডিজাইন ও ছবি সংগ্রহ করে। আদি জামদানি বস্ত্রের চিত্রে ফুটে ওঠে বয়নসৌকর্যের মহিমা, যা বাংলাদেশের বয়নশিল্পীরাই এককালে সম্ভব করেছিলেন। সেই ডিজাইনগুলোই নিখুঁতভাবে এখন বয়নশিল্পীরা তুলে এনেছেন তাঁতে। অনুষ্ঠানে পাঁচ জন শ্রেষ্ঠ জামদানি বয়নশিল্পী ও তাদের সহকারীদের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পুরস্কার দেওয়া হয়। এরা হলেন—ওস্তাদ মো. সজিব হোসেন ও তার সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন, মো. মোতালিব ও সহকারী নূর আলম, মো. মুনির ও সহকারী আবু বকর, ওস্তাদ মো. সিদ্দিক ও সহকারী মাকসুদা এবং মো. জামাল ও সহকারী শাকিল। প্রদর্শনী চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।