রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার বেলাল!

চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মোহাম্মদ বেলাল নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুকে ঘিরে নিহতের পরিবার ও পুলিশের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। আবার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বেলাল ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের’ শিকারে পরিণত হয়ে থাকতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মনে করছে। সূত্রগুলোর দাবি, পুলিশ আসলে বেলালকে আদালতে সোপর্দ করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গভীর রাতে তাকে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজানো হয়।

বেলালের পরিবারের দাবি,             একসময় নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলেও গত কয়েক বছর যাবত্ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছিল বেলাল। নিয়মিত নামাজ পড়ত। তাবলিগ জামাত করত। পুলিশ তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে আত্মসমর্পণ করায়। এজন্য থানায় ‘৪৫ হাজার টাকা ঘুষ’ দেওয়া হয়। সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাকের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে গত বুধবার ঢাকা থেকে এসে সরাসরি খুলশী থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন বেলাল। একটি অনলাইন টিভির এক সাংবাদিক আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের সঙ্গে বেলালের মধ্যস্থতা করিয়ে দেন। তবে আত্মসমর্পণের পর আদালতে সোপর্দ না করে থানাহাজতে প্রায় ১২ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় বেলালকে। তারপর গভীর রাতে অস্ত্র উদ্ধারের নাম করে অভিযানে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়।

তবে পরিবারের এসব অভিযোগের পুরোটাই অস্বীকার করেছে পুলিশ। এ ব্যাপারে উপকমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক ইত্তেফাককে বলেন, বেলাল পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি। কারণ ঘটনাস্থলে পুলিশ একটাও গুলি ছুড়েনি। রাবার বুলেট ছুড়েছিল। সহযোগীরা বেলালকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেলালের মৃত্যু হয়। খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, ২০ মিনিটের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন এসআই ও দুই জন কনস্টেবলসহ তিন জন আহত হন। 

বেলালের পরিবারের বক্তব্য

বেলালের বোন মিনু আক্তার গতকাল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বুধবার সকাল ১০টায় আমার ভাই আমাকে কল করে বলে—বোন, আমি থানায় আত্মসমর্পণ করতে আসছি। আত্মসমর্পণ করার পর আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিলে জেল খেটে আমি জামিনে বের হব। তোরা নামাজ পড়ে আমার জন্য দোয়া করিস। কিন্তু পুলিশ আমার ভাইকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। তারা আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে।’ আত্মসমর্পণের পর পুলিশ বেলালের পরিবারের কাছ থেকে ‘৪৫ হাজার টাকা ঘুষ’ নিয়েছে দাবি করেন মিনু আক্তার।

বেলালের ছেলে মোহাম্মদ সজীব সাংবাদিকদের বলেন, আত্মসমর্পণের জন্য রাজু আংকেলের (অনলাইন টেলিভিশন ‘জেটিভি’র সাংবাদিক) মাধ্যমে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে আব্বু। রাজু আংকেল ডিসি (উত্তর) বিজয় বসাক স্যারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তখন স্যার আমাদের জানান, তিনি আগে আব্বুর অপরাধের ফাইল দেখবেন, তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। এরপর দুই মাস আগে তিনি রাজু আংকেলকে বলেন, আমরা বেলালের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছি। তাকে আমরা ভালো হওয়ার সুযোগ দেব। এর জন্য তাকে থানায় আত্মসমর্পণ করতে হবে। এর জন্য তিনি দুই মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করানোর পরামর্শ দেন। এরপর উনার (বিজয় বসাক) পরামর্শে দুই মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যু করার পর পরশু তিনি (বিজয় বসাক) বলেন, আমি থানায় বলে দেব। বুধবার বেলালকে থানায় আত্মসমর্পণ করতে বলবেন। এরপর তার পরামর্শে বুধবার সকালে থানায় গিয়ে আমার আব্বু আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের পর থানার সেকেন্ড অফিসার নূর উদ্দিন স্যার এসে চা-পানি খাওয়ার কথা বলে ওসি স্যারের জন্য ৩০ হাজার টাকা, তদন্ত অফিসারের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং তার নিজের জন্য ৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর আগে ক্রসফায়ারে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে খুলশী থানার তত্কালীন ওসি শেখ নাছির উদ্দিন আমাদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান সজীব।

পুলিশ কর্মকর্তা বিজয় বসাক ইত্তেফাককে বলেন, আইন অনুযায়ী যে কোনো আসামিকেই আমরা আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাই। বেলালকেও আত্মসমর্পণের কথা বলেছি। পুলিশের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারা ঘুষ নিয়েছে সেটা লিখিতভাবে জানাতে বলেছি। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেব। আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি পুলিশের হাতে মৃত্যুর বিষয়টি কতটা স্বাভাবিক জানতে চাইলে বিজয় বসাক বলেন, দেখুন সে (বেলাল) একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। আগেই বলেছি সে পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি। তার বিরুদ্ধে ১৩টা মামলা আছে। আমরা তাকে পরদিন আদালতে নিতাম। কিন্তু সে নিজের মুখেই অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ কারণেই তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ এটা কোনো ভুল কাজ করেনি। 

নিহত মোহাম্মদ বেলাল কুমিল্লার চান্দিনা থানার কঙ্গাই গ্রামের জনৈক আব্দুল কাদেরের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানাধীন আমবাগান পুকুরপাড় এলাকার নাজমুলের কলোনিতে থাকতেন। পুলিশ জানায়, বেলালের নামে বিভিন্ন থানায় খুন, ডাকাতি ও মাদকের ১৩টি মামলা রয়েছে।

জানতে চাইলে খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আত্মসমর্পণ করার পর বৃহস্পতিবার বেলালকে আদালতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু রাতে তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানায় তার অস্ত্রগুলো জালালাবাদ এলাকায় রয়েছে। সে তার ৭/৮ জন সহযোগীর নামও আমাদেরকে বলেছে। এরপর তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সেখানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বেলাল গুলিবিদ্ধ হয়। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার বেলাল!

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র মতে, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণের সহযোগী হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন বেলাল। আবার হিরণ চসিক মেয়র আ জ ম নাছিরের ঘনিষ্ট হলেও স্থানীয় এমপি ডা. আফসারুল আমীন ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সাথে বিভিন্ন কারণে দূরত্ব আছে। এর পাশাপাশি এমইএস কলেজ ভিত্তিক ছাত্রলীগের একটি অংশের সাথে হিরণ ও বেলালের বিরোধ চলছিল বলে জানা গেছে।