অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার মুখে বাংলার অহংকার জামদানি। ইউনেস্কো ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তালিকায় বাংলাদেশের জামদানির বয়ন পদ্ধতিকে স্থান দিয়েছে। জামদানি বাংলার অহংকার। মোগল আমলে জামদানি যে অহংকার নিয়ে বিরাজ করছিল, ধীরে ধীরে সেই জামদানি তার অবস্থান হারাতে থাকে। জামদানির প্রাণ হচ্ছেন তার বয়নশিল্পীরা, যারা বংশপরম্পরায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অথচ বয়নশিল্পীরা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পেশা বদলে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। বর্তমানে কিছু দেশীয় ফ্যাশন হাউজের চাহিদার কারণে কিছু তাঁতি জামদানি বয়নের সঙ্গে যুক্ত আছেন। কিন্তু পেশায় নতুন করে বয়নশিল্পীরা আসতে চাইছেন না। এ প্রসঙ্গে গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতির ধারক জামদানিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। এর ডিজাইন, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি তাঁতিদের পৃষ্ঠপোষকতা। কারণ ভালো জামদানি তৈরিতে যে সময় লাগে, সে তুলনায় টাকা খুব কম পান তাঁতিরা। তাই তাঁতিদের আর্থিক সচ্ছলতা আনার দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তাঁতিদের ভর্তুকি মূল্যে ভালো মানের সুতা সরবরাহের দাবিও জানান তারা। সেইসঙ্গে গ্রামীণ নারীরা এই জামদানি বোনার দিকে যাতে এগিয়ে আসেন, সে জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের কথাও জানান উদ্যোক্তারা।
গৌরবময় ঐতিহ্য
অথচ কী গৌরবময় একটা সময়ই না পার করেছে আমাদের জামদানি। মুসলিমদের হাত থেকে সৃষ্টি এই জামদানির কী কদরটাই না ছিল মোগল বাদশাহদের কাছে। ইংল্যান্ডের রাজদরবারেও জামদানির কদরের কথা জানা যায়। ব্যয়বহুল জামদানির উত্পাদন একচেটিয়াভাবে বহুকাল মোগলদের হাতেই ছিল। ঢাকায় সদর মলমল খাস কুটির দারোগা জামদানি তৈরির জন্য তাঁতিদের দাদন দিয়ে জামদানি বুননে নিয়োগ করা হতো। এভাবে উত্পাদিত জামদানির মূল্য অনেক বেশি হতো। রাজাদের জন্য বেশি দামের জামদানি বোনা হতো রাজকীয় কারখানায়। অভিজাত ধনীরাও নিজেদের ব্যবহার্য জামদাগর নিয়োগ দিতেন। বিশ্ববাজারেও এসব বহুমূল্য জামদানির ব্যাপক চাহিদা ছিল। এশিয়া ও ইউরোপের রাজারা ঢাকাই জামদানির জন্য ব্যবসায়ীদের অর্ডার দিতেন। কিন্তু উনিশ শতকের প্রথম দিক থেকে বেশি দামের জামদানি উত্পাদন স্বল্প দামের মিলের কাপড়ের কাছে চাহিদা হারাতে থাকে।
১৭৪৭ সালের এক হিসাব অনুযায়ী দিল্লির বাদশাহ, বাংলার নবাব এবং জগত্ শেঠের জন্য সাড়ে ৫ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়েছিল। একই বছর ইউরোপীয় বণিক ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাড়ে ৯ লাখ টাকার মসলিন কিনেছিল। ১৮ শতকের শেষের দিকে মসলিনের রপ্তানি অনেক কমতে থাকে। ১৭৬৫ সালে ইংরেজদের দেওয়ানি লাভের পর তারা তাঁতিদের ওপরে অত্যাচার শুরু করে। জামদানি বুনিয়ে ইচ্ছেমতো দাম দিত ইংরেজরা। ১৭৮৭ সালে ৫০ লাখ টাকার ঢাকাই মসলিন ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়েছিল। ১৮০৭ সালে রপ্তানির পরিমাণ সাড়ে ৮ লাখ টাকায় নেমে আসে এবং ১৮১৭ সালে রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ব্যক্তিবিশেষের মাধ্যমে ইউরোপে মসলিন পাঠানো হতো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি জামদানি মসলিনের এক হিসাবে দেখা যায়, সাদা জমিনবিশিষ্ট কাপড়ের ওপর ফুল করা ৫০ হাজার টাকা মূল্যমানের জামদানি মসলিন দিল্লি, লখনৌ, নেপাল, মুর্শিদাবাদের নবাব-বাদশাহরা ব্যবহার করতেন।
ফিরে আসছে সুদিন
এখন জামদানির সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। মানুষের কাছে চাহিদা বাড়তে থাকায় তাঁতিরাও কাজ করছেন। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি, সেই গবেষণা শুরু হয়েছে। জামদানি কারুশিল্পের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও কারুশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা পরিচালিত হয়। এরই অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী জামদানি নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘ট্র্যাডিশনাল জামদানি ডিজাইনস’ শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।
দেশ-বিদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া জামদানির মৌলিক ৬৭টি নকশা খুঁজে বের করেন গবেষকেরা। এছাড়া গবেষণায় ৩৯০টি নকশা পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি ২০৭ জন তাঁতির একটি ডাটাবেইজ তৈরি করা হয়েছে সেই গবেষণায়।
ডিজাইনার চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। যারা সভ্য জাতি, তারা ঐতিহ্য ধরে রেখে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আমাদেরও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য সেই কাজ করে যেতে হবে। জামদানির দাম বাজারে বেশ চড়া; অথচ তাঁতিরা টাকা পান না। ফলে ব্যবস্থাপনায় গলদ রয়েছে। এটা কাটিয়ে উঠে তাঁতিদের টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একে টিকিয়ে রাখতে বাজার সম্প্রসারণ, তাঁতিদের সঠিক দাম নিশ্চিত করা, ডিজাইন সংরক্ষণসহ সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
যেভাবে বোনা হয় জামদানি
একটি ভালো জামদানি শাড়ি তৈরি করতে তাঁতিদের এক থেকে দুই মাস সময় লেগে যায়। সে তুলনায় তারা মজুরি পান খুব কম। জামদানি বুনতে একেকটি তাঁতে দুজন তাঁতি পাশাপাশি বসেন। দুটি সুচাকৃতির বাঁশের কাঠিতে নকশার সুতা জড়ানো থাকে। প্রয়োজনীয় স্থানে সুচ দুটি দিয়ে পরিমিত টানায় সুতার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রঙিন সুতা বুনন করা হয়। এরপর পাশের সুতার মাকু একজন তাঁতি পাশ থেকে অন্য তাঁতির কাছে দিলে তা সেদিক থেকে বের করে নেওয়া হয়। এভাবেই ফুটে ওঠে জামদানি। সাদা জমিনে সাদা সুতার নকশাও সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। কারণ জমিনের তুলনায় নকশার সুতা মোটা হয়। প্রাচীনকালে তো রঙের ব্যবহার কম হতো। এখন রঙের ব্যবহারের কারণে জামদানি হয়ে উঠেছে আরো বর্ণিল।
জামদানির জ্যামিতিক অলংকরণ
সাম্প্রতিক সময়ে ঐতিহ্যবাহী জামদানি নকশাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস চলছে। ছোটো ছোটো বিভিন্ন ফুলের বুটি তোলা জামদানি বুটিদার নামে পরিচিত। জামদানিতে ছোটো ছোটো ফুল যদি তেরছাভাবে সারিবদ্ধ থাকে, তাকে তেরছা জামদানি বলে। এই নকশা শুধু যে ফুল দিয়েই হবে তা নয়, ময়ূর বা লতাপাতা দিয়েও হতে পারে। ফুল, লতার বুটি জাল বুননের মতো সমস্ত জমিনে থাকলে তাকে জালার নকশা বলা হয়। সারা জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি ফুলওয়ার নামে পরিচিত। ডুরিয়া জামদানি ডোরাকাটা নকশায় সমৃদ্ধ থাকে। বেলওয়ারি নামে চাকচিক্যপূর্ণ সোনা-রুপার জরিতে জড়ানো জামদানি মোগল আমলে তৈরি হতো। এ ধরনের জামদানি সাধারণত হেরেমের নারীদের জন্য বিশেষভাবে বোনা হতো।