নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির শেষ দিনে গতকাল প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন বিএনপির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী। গতকাল ২৩৩টি আপিলের মধ্যে ১১৪টি আপিল গ্রহণ করে কমিশন। প্রথমদিনে ৮০ জন, দ্বিতীয়দিনে ৭৮ জন প্রার্থিতা ফিরে পান। প্রথম দুইদিনে পেন্ডিংয়ে থাকা ৪ জন বৈধতা পেয়েছেন। মোট তিনদিনের শুনানিতে ২৭৬ জন অর্থাত্ পৌন তিন শতাধিত মনোনয়নপত্রের বৈধ হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মোঃ রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী নির্বাচন ভবনে এই শুনানিতে বিচারকের আসনে ছিলনে। রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে শেষদিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন বিএনপির সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী এম মোরশেদ খান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপির সাবেক এমপি নাদিম মোস্তফা, তৃণমূল বিএনপির সভাপতি নাজমুল হুদা। অপরদিকে বাদ পড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রার্থী। আপিল শুনানিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির মির্জা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হয় বাছাইয়ে। রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই আসনে ১৪ দলের প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আপিল করেন। আপিল শুনানিতে মেননের আইনজীবী আব্বাসের মনোনয়নপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলেও তা না-মঞ্জুর করে ইসি। এর মাধ্যমে আব্বাসের মনোনয়নপত্র বৈধই থাকল। এদিকে মির্জা আব্বাসের পাশাপাশি তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাসও ফিরলেন প্রার্থিতা নিয়ে। টেলিফোন বিল বকেয়া ও ঋণ খেলাপি হওয়ায় ঢাকা-৯ আসনে ধানের শীষের টিকিট পাওয়া মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছিলেন তিনি। শনিবার নির্বাচন কমিশন তার আপিল আবেদন মঞ্জুর করে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী আমানউল্লাহ আমান আপিল করেও তার প্রার্থিতা ফেরত পাননি। বাছাইয়ে বিএনপির এই নেতার মনোনয়নপত্র সাজার কারণে বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আমানের আপিল না-মঞ্জুর করে শনিবার সিদ্ধান্ত জানায় ইসি। আমান বাদ পড়লেও ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীর চরের ওই আসনে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকছেন আমানের ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমিত।
প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে রয়েছে শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী। এছাড়া আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, জেএসডি, জাকের পার্টি, ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, এনপিপি, বিএনএফ ও সিপিবিসহ একডজন দলের অর্ধশত প্রার্থী রয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটের ইতিহাসে এত সংখ্যক সংক্ষুব্ধ ব্যািক্তর আপিল আবেদনের শুনানি হয়নি কমিশনে। তিন দিনে এসব আপিল নিষ্পত্তি করতে কমিশনকে হিমশিম খেতে হয়েছে। বিশেষ করে, আবেদনকারীদের সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করতে গিয়ে চরম অব্যবস্থাপনা ছিল নির্বাচন কমিশনে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আজকের মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী নিশ্চিত করতে ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। তা না হলে প্রতীক বরাদ্দের সময় নতুন করে জটিলতায় পড়তে হবে দলগুলোকে। জোটের একক প্রার্থী রাখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দলের প্রার্থীকে নিজ উদ্যোগেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হবে। আপিলে বৈধতা পাওয়া বিএনপির উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন: চাঁদপুর-৪ জেড খান মো. রিয়াজ উদ্দিন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা- মামাচিং, চট্টগ্রাম-৮ মোরশেদ খান, রাজশাহী-৫ মো. আবু বকর সিদ্দিক, রাজশাহী-৬ মো. আবু সাঈদ চাঁদ, টাংগাইল-১ ফকীর মাহবুব আনম স্বপন, ঢাকা-১৭ শওকত আজিজ, ঢাকা-১৯ মো. কফিল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৪ মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৫ কাজী নাজমুল হোসেন, নীলফামারী-১ এ আহম্মেদ বাকের বিল্লাহ, রাজশাহী-৫ মো. নাদিম মোস্তফা, রাজশাহী-৪ মুহাম্মদ আবদুল, কুমিল্লা-৬ সৈয়দ গোলাম মহিউদ্দিন, গোপালগঞ্জ-৩ এস এম জিলানী।
বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে আপিল খারিজ হয়েছে- ফেনী-১, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭ খালেদা জিয়া, চট্টগ্রাম-৫ মীর মো. হেলাল উদ্দিন, ঝিনাইদহ-২ মো. মশিউর রহমান, কুমিল্লা-৪ মো. রুহুল আমিন, চাঁদপুর-৪ মো. হারুন অর রশিদ, রংপুর-৫ শাহ মো. সোলাইমান আলম, চট্টগ্রাম-৭ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, পাবনা-৩ হাসানুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ-১ সেলিম রেজা প্রমুখ। অন্যান্য দলের মধ্যে রয়েছেন- ইসলামিক ফ্রন্ট: ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া-২ মো. মহিউদ্দিন মোল্লা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী: চট্টগ্রাম-৫ মো. নাসির উদ্দিন। জাপা: যশোর-২ মো. ফিরোজ শাহ। জাপার বাদ পড়েছেন- সিলেট-৪ এম ইসমাইল আলী আশিক, সুনামগঞ্জ-২। জেএসডি’র বৈধদের মধ্যে রয়েছেন-ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া-৬ এ কে এম জাবির, যশোর-৩ সৈয়দ বিপ্লব আজাদ। এছাড়া জাগপা: যশোর-৫ মো. নিজামুদ্দিন অমিত, ইসলামী আন্দোলন: যশোর-৫ মো. ইবাদুল খালাসী, সিলেট-৫ মো. নুরুল আমিন, রংপুর-৪ মো. বেলাল হোসেন, বৈধ হয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের হবিগঞ্জ-১ আবু হানিফা আহমদ হোসেন বাদ পড়েছেন। এনপিপি থেকে কুষ্টিয়া-৪ মো তসির উদ্দিন, যশোর-৪ মো. আলী জিন্নাহ বৈধতা পেয়েছেন। গণফোরামের বৈধতা পেয়েছেন, গণফোরাম: ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া-২ শাহ মফিজ, জামালপুর-৩ নঈম জাহাঙ্গীর, কুমিল্লা-৩ মোহাম্মদ আকবর আমিন বাবুল, যশোর-২ এম আছাদুজ্জামান, ঢাকা-৩ মোস্তফা মহসীন মন্টু প্রমুখ। মুসলিম লীগের চুয়াডাঙ্গা-১ মোছাঃ মেরিনা আক্তার, সিলেট-১ মো. আনোয়ার উদ্দিন বোরহানের আপিল গৃহীত হয়েছে। বাদ পড়েছে মুসলিম লীগ: ঢাকা-২ সৈয়দ মঈন উদ্দিন রিপন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আপিল গৃহীত হয়েছে- ঢাকা-১৭ নাজমুল হুদা, ময়মনসিংহ-৩ নাজনীন আলম, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা-নতুন চাকমা, জয়পুরহাট-১ মো. আলেয়া বেগম, সিরাজগঞ্জ-৫ মো. আলী আলম, রাজশাহী-১ মো. মুজিবুর রহমান, লক্ষ্মীপুর-২ এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঞা, সুনামগঞ্জ-৩ মো, রফিকুর ইসলাম, নীলফামারি-৩ মো. আব্দুল ওয়াহেদ, রাজশাহী-৩ মো. মেরাজ উদ্দিন মোল্লা প্রমুখ। কৃষক শ্রমীক জনতা লীগের ময়মনসিংহ-৯ আলমগীর কবির, টাংগাইল-৪, টাঙ্গাইল-৮ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বাদ পড়েছেন। বিএনএফ: ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া-৩ সৈয়দ মাহমুদুল হক, চট্টগ্রাম-১৩ নারায়ন রক্ষিত, বৈধতা পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের কুষ্টিয়া-১ আফাজ উদ্দিন আহমেদ. মেহেরপুর-২ এম এ খালেক আপিল গৃহীত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেত্রকোনা-১ মো. এরশাদুর রহমান, মেহেরপুর-১ মো. ইয়ারুল ইসলামের আপিল খারিজ করেছে কমিশন। বৈধতা পেয়েছেন জাকের পার্টির যশোর-১ মো সাজেদুর রহমান, যশোর-৪ লিটন মোল্লা, যশোর-৫ রবিউল ইসলাম, ঝিনাইদহ-২ আবু তালেব সেলিম, হবিগঞ্জ-৪ মো. আনছারুল হক, নারায়ণগঞ্জ-১ মাহফুজুর রহমান। বাদ পড়েছেন জাকের পার্টির ঠাকুরগাঁও-১ মো. আল মামুন,। সিলেট-২ ইয়াহইয়া চৌধুরী (গ্রহণের বিরুদ্ধে ৩টি) আপিল করেছে ইসি। এছাড়া টাঙ্গাইল-৫ গ্রহণের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক, পিডিপি সাতক্ষীরা-৪ গ্রহণের বিরুদ্ধে রবিউল ইসলাম জোয়ার্দার, ময়মনসিংহ-২ গ্রহণের বিরুদ্ধে ফারমার্স ব্যাংকের খারিজ হয়েছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক আফরোজা খান রীতার বিরুদ্ধে আপিল খারিজ বাতিল, নারায়ণগঞ্জ-৩ লিয়াকত হোসেন খোকার গ্রহণের বিরুদ্দে আপিল বাতিল, টাঙ্গাইল-৬ আসনের আহসানুল ইসলাম টিটুর বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের আপিল বাতিল, কক্সবাজার-৩ সাইমুম সারোয়ার বিএনপির প্রার্থী লুত্ফর রহমানের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে কুমিল্লা-৯ মো. তাজুল ইসলামের আপিল খারিজ। কক্সবাজার-২ মোহাম্মদ শফিউল আলম মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, কুমিল্লা-৪ মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, চাঁদপুর-৪ মো. আবদুল হান্নান, মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, ফেনী-২ নিজাম উদ্দিন হাজারীর মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, বগুড়া-৩ এম সরওয়ার খান গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল খারিজ, টাঙ্গাইল-২ খন্দকার মশিউজ্জামান গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল খারিজ, রাশেদ খান মেনন মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে আপিল বাতিল, রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মনোনয়ন বাতিলের আবেদন খারিজ করে ইসি।