প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর নেপথ্যে

জসীম উদ্দীন

প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখেরও বেশি মানুষ বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমাচ্ছে প্রবাসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছে। মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক আয়ের এই খাতের (রেমিট্যান্স) অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। তবে যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের মায়া ত্যাগ করে, আত্মীয়স্বজনদের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে এ বিশাল অবদান রেখে যাচ্ছে তারা কেমন অবস্থায় আছে তা নিয়ে আমাদের কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

‘প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ জন শ্রমিকের লাশ আসছে। এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে এসেছে ২ হাজার ৬১১টি লাশ। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশই মারা গেছেন স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে। এরপর দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ১৮ শতাংশ। আর স্বাভাবিক মৃত্যু পাঁচ শতাংশ।’ ৭ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর এ প্রতিবেদনটি দেখে থমকে গেলাম।

অভিবাসন খাত-সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞরা উচ্চ অভিবাসন ব্যয়কে প্রবাসীদের মানসিক চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সেটি যথার্থ। ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে টাকা শোধ করার চাপের কারণে অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা রয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে। ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করার কারণে নিয়মিত ঘুমানোর সুযোগ পান না শ্রমিকেরা। এসব কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। এগুলোর পিছনে রয়েছে আরো কিছু কারণ যা আমরা বোঝার চেষ্টা করি না। গত মাসে (আগস্ট) ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডির) আয়োজনে সিলেটে ‘পলিসি ক্যাম্প ২০১৯’ অংশ নিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিল্ড ভিজিটে গিয়েছিলাম সিলেট টেকনিক্যাল ট্রেইনিং সেন্টারে (টিটিসি)। বিদেশগামী প্রক্ষিণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি বিদেশগামী শ্রমিকদের গল্প।

দালাল চক্রের জটিলতা আর কিছু বেসরকারি খাতের জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাগামহীনতা এগুলোর পিছনে বড়ো ভূমিকা পালন করছে। আবার বিদেশগমণকারী শ্রমিকদের অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সঠিক তথ্যের অপ্রাপ্তি এবং অজ্ঞতার কারণেই এটা সম্ভব হচ্ছে। তাই সহজেই তারা দালাল চক্র এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বশে চলে আসে। তারা বিদেশে গিয়ে কি কাজ করবে তা তারা আগে থেকে জানতে পারে না। এমনকি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যারা বিদেশ যাওয়ার পূর্বে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তারাও জানে না বিদেশে গিয়ে কি কাজ করবে। বাধ্য হয়ে তখন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। যেটি তাদের জন্য অনেক বড়ো মানসিক চাপের কারণ। আবার শ্রমিকের নিজ দক্ষতার স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট না থাকাও তাদের ভালো কাজ পাওয়ার পথে বড়ো একটি অন্তরায়। প্রবাসী শ্রমিকরা যে যে কাজে দক্ষ সে দক্ষতার স্বীকৃতি থাকলে ভালো কাজ পেতে সহায়ক হয়। যেটি বাংলাদেশের শ্রমিকরা পায় না।

প্রবাসীদের কর্মপরিবেশকে নিরাপদ করতে হলে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রবাস গমন-সম্পর্কিত সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ এই তথ্যের অপ্রাপ্তির কারণেই তারা নানাবিধ হয়রানির শিকার হয়। আর মানসিক চাপের বীজ বপিত হয় দেশের মাটিতেই। বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দক্ষতার স্বীকৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। কাজের অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য টিটিসিগুলো চুক্তিপত্র দেখে তাদেরকে ভর্তি করলেও কিছুটা লাঘব হবে, দালালের দৌরাত্ম্যও কমবে। সঙ্গে সঙ্গে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের তিন দিনের প্রশিক্ষণের মেয়াদ বাড়ানো জরুরি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়