সিলেটের হিদাইর খালে বাঁধ

হুমকির মুখে হাওরের জীববৈচিত্র্য

সরকারি নথিপত্রে নদীর নাম বাউলি খাল হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে এটি হিদাইর খাল নামে পরিচিত। কিন্তু এই হিদাইর খালের উত্সমুখে একটি অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে লক্ষাধিক মানুষ একদিকে জলাবদ্ধতা, অপরদিকে পানির সংকটে ভোগে প্রায় সারা বছর। তাছাড়া এলাকার ৩৪টি হাওরের জীববৈচিত্র্যও এখন হুমকির মুখে। ২০১৬ সালে এলাকাবাসী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের  আর্থিক সহায়তায় ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এলাকাবাসী জানান, আলীরগাঁও ইউনিয়নের খলা, বুধিরগাঁও ও তিতকুল্লি—এই তিন গ্রামের প্রায় ১ লাখ লোকের চলাচলের কোনো সড়ক ছিল না। নৌকা ছাড়া তারা ঘর থেকে বের হতে পারত না। তাই নদীটির উত্সমুখে হিদাইর খালের ওপর এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এখন এলাকা ও পরিবেশে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডও বলেছে, অপরিকল্পিত এই বাঁধের জন্য এলাকার জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। হিদাইর খালের বাঁধ নিয়ে আইডব্লিউএফএম গবেষণা করছে। গবেষণা প্রতিবেদন পাওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা জানান। 

এলাকাবাসী জানান, বাঁধটি নির্মিত হওয়ায় ঐ তিন গ্রামের বাসিন্দাদের যাতায়াতে সুবিধা হলেও বাঁধের কারণে কৃষি ও জলমহালবেষ্টিত জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাটের বহু গ্রাম ও হাওর মরুভূমি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে বাঁধ নিয়ে এলাকাবাসী এখন দুই ভাগে বিভক্ত। বাউলিখাল দিয়ে সারি নদীর এক-তৃতীয়াংশ পানি প্রবাহিত হতো এবং পাহাড়ি ঢলের সময় পানি পাঁচ-ছয় ঘণ্টার মধ্যে নেমে যেত। কিন্তু হিদাইর খালের মুখে বাঁধের কারণে ঢলের সময় সারি নদীর পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দুই-তিন মিটার বেড়ে যায়। ঢল ও বন্যার সময় সারি নদী ও শাখা নদীগুলোর পানি নামতে সময় লাগে। এসময় জমাট পানিতে নদীর তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এতে জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ও আলীরগাঁও ইউনিয়নের মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীগর্ভে বিলিন হচ্ছে এলাকার বসতভিটা, কৃষিজমি, মসজিদ ও কবরস্থান। এলাকাবাসীর মতে, এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে এলাকার জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে হিদাইর খালের বাঁধ অপসারণ করা হলে ঐ তিন গ্রামের মানুষ কীভাবে ঘর থেকে বের হবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।

এদিকে হিদাইর খালের বাঁধ অপসারণের দাবিতে গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সারি নদী বাঁচাও আন্দোলন, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ ও স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে জৈন্তাপুর উপজেলার রাংপানি নদীর তীরে এক গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। এসময় বক্তারা বাউলীখাল নদীর উত্সমুখে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীকে হত্যার আয়োজন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া বাঁধের কারণে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়-বিলের প্রাণ, পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। বদলে যাচ্ছে ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। তাই অবিলম্বে তারা এই অবৈধ বাঁধ অপসারণের দাবি জানান।