স্বেচ্ছামৃত্যুর পথে বাধ্য হয়ে কারা হাঁটে?

ঈদুল আজহার শেষ মুহূর্তের আনন্দ-আয়োজনে ব্যস্ত যখন পুরো দেশ, তখন এই দেশেরই এককোণে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার খালগোড়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা আকতার নিভৃতে আত্মহননের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কারণ, বেপরোয়া বখাটেদের ‘প্রতিরোধহীন’ উপদ্রব। বছরব্যাপী এই বঙ্গদেশে উত্সব-পার্বণে, খরা-বর্ষায়, শীত-গ্রীষ্মে কত শত স্বর্ণাকেই না এভাবে চলে যেতে হচ্ছে। আমাদের মন ও মগজ-সওয়া এসব ঘটনার মধ্যে এটি একটি মাত্র।

সন্তান হারানোর অতল শোকে কাতর স্বর্ণার পরিবারে কতটা অন্ধকার ঘিরে আছে, তার কোনো খবর কেউ রাখে না। বখাটে-সন্ত্রাসী-মাস্তানদের দৌরাত্ম্য যখন সমাজের পরিচয়চিহ্ন, তখন এসব ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক। এই নিয়তি-তাড়িত অকাল মৃত্যু বেছে নিতে ‘বাধ্য’ হলো আরেক কিশোরী, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার দশম শ্রেণির ছাত্রী রুকাইয়া আক্তার। লাগামছুট বখাটেদের উত্পাতে অতিষ্ঠ হয়ে ঘুমের বড়ি খেয়ে সেও অন্যায়ের কাছে হার মানতে ‘বাধ্য’ হলো।

২. দেশে আইন-আদালত আছে—এ কথা নিশ্চয়ই অজানা ছিল না স্বর্ণার। দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার এ-ও নিশ্চয়ই জানা ছিল যে অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া মানুষ হিসেবে তার অধিকার। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নানা উন্নয়নের বার্তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এই ডিজিটাল যুগে অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে সরকারের ইস্পাতদৃঢ় (!) অবস্থানের কথাও তার জানার সীমার মধ্যেই ছিল বলে ধরে নেওয়া চলে। তবু মেয়েটি পুলিশ-প্রশাসনের কাছে গেল না, কোথাও ফরিয়াদ জানাল না, কারো কাছে প্রতিকার চাইল না। আবার বিচার চাইলও বটে, তবে তা ‘মৃত্যুসনদে’; আত্মহত্যার আগে নিজের লেখা চিরকুটে। কেন? রুকাইয়া অবশ্য সেটুকুও চায়নি। অতীতের অন্য অনেক ঘটনায় বিচারহীনতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্বর্ণারটাও তো তার ভান্ডারে যুক্ত হয়েছিল। তাই সে সমাজের প্রতি ন্যূনতম দাবিটুকুও এলান করে যায়নি। নাকি ভরসা পায়নি? এই সমাজ কি তবে সসম্মানে বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম ভরসা যোগায় না স্বর্ণা-রুকাইয়াদের? রাষ্ট্র কি এতটুকু প্রতিকারের আস্থা দেয় না পীড়িতদের? ন্যায়বিচার কি কিতাবে মুদ্রিত ‘শব্দবন্ধ’ মাত্র? একটা চৌদ্দ-পনেরো বছরের মেয়ে উত্সবের রঙে নিজেকে রাঙাতে চাইল না, নতুন পোশাকে-সাজে নিজেকে পছন্দের কোনো আইডল রূপে দেখতে চাইল না, এমনকি মনের গহিনে উঁকি দেওয়া আবছা রাজকুমারের ছবি আঁঁকার সলজ্জস্বাদও নিতে চাইল না—স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিল! বখাটেদের কুকথা, সারমেয়সম আচরণ, তাদের ভয়ংকর হুমকি এতটাই ‘অপ্রতিরোধ্য’ ঠেকে যে স্বর্ণা মৃত্যুকেই একমাত্র ‘আশ্রয়’ ভাবতে বাধ্য হয়। কিশোরী রুকাইয়ার মনের দরজায়ও রঙিন জীবনের কোনো হাতছানি দেখতে পেল না। অথচ দুটি মেয়েরই আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল সমাজের, ওদের ভরসাস্থল হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের। মনোবল জোগানোর কথা ছিল আইনের শাসনের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাকত পাওয়ার কথা ছিল ওদের বিচারব্যবস্থার কাছ থেকে।

৩. কেউ কেউ হয়তো ‘এই পরিসরে’ পরিসংখ্যান হাজির করে নারী নিপীড়ন প্রতিরোধে তুলনামূলক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে সচেষ্ট হবেন। আগের আমলের তুলনায় কতটা সচেতনামূলক ও প্রতিরোধমূলক নানা কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে কিংবা গত কয়েক বছরে যৌন নিপীড়নের হার কতটা নিম্নমুখী ইত্যাদি সংখ্যাতাত্ত্বিক ফলাফল দেখিয়ে নিশ্চিন্তির আজদাহা ঢেঁকুর তুলবেন তারা। তা তুলুন। কিন্তু এ বছরের যদি কেবলএ দুটি ঘটনাই আমলে নেওয়া হয় এবং ধরে নেওয়া হয় যে বছরের বাকি দিনগুলোতে আর একটিও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, তাহলেও কি এ দুটি আত্মহত্যার ঘটনা আমল-অযোগ্য হয়ে পড়ে?

স্বর্ণা-রুকাইয়ার সামনে কি এমন যথেষ্ট নজির ছিল যে নারী উত্ত্যক্তের ঘটনায় অপরাধীর বিচার হয়? নিপীড়নকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতে রাষ্ট্র সদা তত্পর, সমাজও সমানভাবে সক্রিয়। আইনের হাত এতটাই লম্বা যে প্রভাবশালী মহলের ছাতার তল থেকেও বখাটে-ধর্ষক-নিপীড়ককে ছোঁ মেরে নিয়ে গরাদে পুরে দেয়। নির্যাতন চালিয়ে কেউ পার পায় না। অন্যায় প্রতিরোধী, ন্যায় প্রতিষ্ঠার এমন ইতিবাচক উদাহরণের ক্ষেত্রে কী বলবেন উন্নয়নের ফেরিওয়ালা পরিসংখ্যানবিদেরা?

৪. নিজেদের হত্যা করার মধ্যে দিয়ে যে ‘বার্তা’ দিয়ে গেল স্বর্ণা-রুকাইয়া, তার মর্মোদ্ধারে রাষ্ট্র কতটা সক্ষম—এই প্রশ্ন না উঠে পারে না। এই সমাজে থেকেও স্বর্ণা-রুকাইয়ারা যে কতটা ‘সমাজচ্যুত’; তারা কীভাবে আশ্রয়হীন, কতটা নিরাপত্তাহীন তা বুঝতেও সমাজ পারগ কি না—ওঠে সে প্রশ্নও। জরুরি এসব প্রশ্নের সূত্রে মাথা তোলে এমন জিজ্ঞাসাও: পুরোদস্তুর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ চরিত্রে খাপ খাইয়ে নেয়নি কি এই সমাজ, রাষ্ট্র? কেননা, কর্তৃপক্ষ কিন্তু নিজের কর্তৃত্ব অটুট রাখার সম্ভাব্য সব কায়দা-কৌশল এস্তেমালে শতভাগ সচেষ্ট ও সক্রিয়। কেবল স্বর্ণা-রুকাইয়াদের দিকেই নজর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না!

৫. আর দশজনের মতো স্বর্ণা-রুকাইয়াও যে নিজেদের সমান ভালোবাসত, তারও প্রমাণ কিন্তু এসব আত্মহননের ঘটনা! ওরা নিজেদের অসম্মান চায়নি, চিল-শকুনের সহজ খাদ্য হতে চায়নি; চায়নি পরিবারকে বিপাকে ফেলতে। তাই তারা স্বেচ্ছামৃত্যুর পথে হেঁটে নিজেদের ‘সুরক্ষিত’ করে গেছে; বেঁচে থাকতেই যে সুরক্ষাপ্রাপ্য ছিল ওদের।

কী বলবে উন্নয়নশীল বাংলাদেশ?

n লেখক : সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com