বছরের প্রথম দিনের শুরুতে তাকে একটা নতুন ডায়েরি দিয়েছিলাম, সঙ্গে একটা কারুকাজের ঘড়ি আর দুটো বলপেন। বলেছিলাম, আমি তো আমার জীবনে অফিসের নথিপত্রে টাকা-পয়সার হিসেব লেখা ছাড়া অন্য কিছুই লেখার অবসর পাইনি। কিন্তু তুমি তো ছিলে অন্যরকম, আমার সব হিসেবের নথিপত্রের বাইরে। তুমি তো আগে বেশ লেখালিখি করতে, গান গাইতে। কখনো জোছনার আলোতে, কখনো শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসতে। আমার সেইসব জোছনা, মেঘ, বৃষ্টি, ফুল, পাখি কিছুই দেখা হয়নি। কারণ, আমার প্রতিটা মুহূর্ত ছিল হিসেবের নিয়মে বাঁধা, আমার জগত্ ছিল অঙ্কের জগত্। এক সময় আমার উপর ভীষণ ক্লান্তি ভর করল। আমার সব হিসেব ভুল হতে শুরু করল। তোমার দিকে ফিরে তাকালাম। মনে হলো অতীতের সেই তুমি যেন এক অচেনা নারী। তুমি আর সেই হেমন্তের জোছনা, শ্রাবণের ঝুমবৃষ্টির মেঘমল্লার নও। তুমি যেন চৈত্রের শূন্য বিরান প্রান্তরে এক শুষ্ক বৃক্ষ, একা, শব্দহীন। আমার ভীষণ কষ্ট হলো। এই প্রথম আমি জীবনের ধারাপাতের বাইরে নিজেকে বদলাতে চাইলাম। প্রাণ সঞ্চার করতে চাইলাম দুজনের সম্পর্কের বৃক্ষ, লতায়। ডায়েরিটা তোমার শীর্ণ হাতে তুলে দিয়ে বললাম, অনেক ভুল করেছি, কিন্তু আর নয়। এখন থেকে তুমি প্রতিদিন কিছু লিখো। লিখো তোমার দিনলিপিতে তোমার হূদয়ের কথা, অপূর্ণতার কথা, কষ্ট, ঘৃণা কিংবা আনন্দের কথা, তোমার কিশোরী বা তরুণী কালের সুপ্ত-গুপ্ত স্মৃতিময় ভালোবাসার কথা...যা ইচ্ছে তাই। সেখানে আমি নাইবা রইলাম তবুও লিখো...লিখো...হে আমার প্রিয় সঙ্গিনী। ঘড়ির কাঁটা এবং আমার হূিপণ্ড সমতালে নিঃশব্দে নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে যায়, আমি শুধু অপেক্ষায় আর অপেক্ষায়...যেন নদীর এপারে খেয়াঘাটের একলা যাত্রী।
বছরের শেষ দিনে, শেষ মুহূর্তে তুমি ডায়েরিটা আমাকে ফেরত দিলে এবং ঘড়িটাও।
দিনলিপির পাতায় পাতায় অনেক লেখালিখি,
প্রতিদিনের বাজার হিসেব—চাল, ডাল, তেল, লবণ...
পুরো বছরের বাজার খরচ...আয়, ব্যয়—জমা খরচ...
আমার কাছে তোমার পাওনা—নিরানব্বুই পয়সা!
আমি নির্বাক। তবুও দায় মেটাতে আমি পুরো একটাকা দিতে চাইলাম।
উত্তর—না।
তবে এক হাজার? এক লক্ষ?
উত্তর—না, না।
দাবি, কম নয়, বেশি নয়, হিসেবের গোনাগুনতি একটি একটি করে নিরানব্বুই পয়সা চাই।
হায়, আমি কোত্থেকে দিই এই নিরানব্বুই পয়সা?
ব্যাংকে, ঘরে, দেরাজে হাজার, লক্ষ টাকার বান্ডিল...কিন্তু খুচরো পয়সা নেই কোথাও। পয়সা হয়তো এখন জাদুঘরে, স্মারকচিহ্ন হিসেবে বিলুপ্ত প্রজাতি। এই নিরানব্বুই পয়সার দায় মেটাবার সাধ্য আমার নেই।
জীবন সঙ্গিনীর দিনলিপিতে আমি নিঃস্ব, দেওলিয়া— সম্পূর্ণ একটা ভুল মানুষ।
জীবনের কিছু কিছু হিসেব, দেনাপাওনা কখনোই পরিশোধ করা যায় না...না ভালোবাসায়, না টাকা-পয়সায়...
কেউ কি আমাকে নিরানব্বুই পয়সা ধার দিতে পারবেন? অথবা নিরানব্বুইটি আনন্দ সময়?