সাত দশকে ঐতিহ্যবাহী ‘নিউ ক্যাফে কর্নার’
আহসান জোবায়ের
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে লালকুঠি হয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়ে মিশেছে নর্থব্রুক হল রোড। বাংলাবাজার ও নর্থব্রুক হল রোডের মিলিত স্থান চৌরাস্তা নামে পরিচিত। পশ্চিম দিকের সড়কটি বাংলাবাজার হয়ে পাটুয়াটুলি আর পূর্বদিকে একই সড়ক বিউটি বোর্ডিং হয়ে সূত্রাপুরে গিয়ে মিশেছে। বাংলাবাজার সড়ক আর নর্থব্রুক হল রোডের কোনায় ২৮, নর্থব্রুক হল হোল্ডিংয়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় এক রেস্তোরাঁ ‘নিউ ক্যাফে কর্নার’। প্রায় ৭০ বছর ধরে পুরান ঢাকাবাসীর কাছে জনপ্রিয় এই রেস্তোরাঁ। কেবল এলাকার মানুষই নয়, শহরের নানা স্থান থেকে মজাদার হরেক খাবারের স্বাদ নিতে ছুটে আসেন রসনাবিলাসীরা। প্রবেশ করতেই দেয়ালে ঝোলানো খাবারের বিভিন্ন পদের মূল্যতালিকা। এলাকার কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, নানা প্রতিকূলতায়ও দীর্ঘদিন যাবত্ খাবারের স্বাদ আর মান ধরে রেখেছে রেস্তোরাঁটি।
জানা যায়, প্রায় ৭০ বছর আগে এই রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন হরি নারায়ণ ঘোষ। তখন এই এলাকায় আর কোনো রেস্তোরাঁ ছিল না। অদূরেই ঐতিহাসিক বিউটি বোর্ডিং। একসময় সেখানে আড্ডা জমাতেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক ও রাজনীতিকেরা। তারাই আবার এখানে ভিড় জমাতেন খাবারের টেবিলে। রেস্তোরাঁর বর্তমান স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সোলায়মান মিয়া। ২৫ বছর আগে হাল ধরেছেন এটির।
রেস্তোরাঁটির জনপ্রিয় আইটেম বা পদ হলো ক্রামচাপ। রেস্তোরাঁর শুরু থেকেই এই আইটেম রয়েছে খাবারের তালিকায়। খাসির মাংসের কাটলেটের মতো খাবারটি পরিবেশন করা হয় গরম গরম পাউরুটির সঙ্গে। ১২৫ টাকায় মিলবে এই খাবার। এ ছাড়া সকালের নাশতায় ১৫ টাকায় মেলে পরোটা ও ডালভাজি। চাইলে পরোটার সঙ্গে নিতে পারেন ডিম কিংবা খাসির ভুনা। খাসির ভুনা পাবেন ৭০ টাকায়। দুপুর ও রাতের খাবারের তালিকায় রয়েছে মোরগ-পোলাও। দাম পড়বে ১১০ টাকা। নাশতার আইটেমে থাকছে আলুর চপ, মোগলাই পরোটা, কাটলেট, চিংড়ি ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই ও ফিশ ফ্রাই। দাম পড়বে মাত্র ১০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই। মজার ব্যাপার হলো, রেস্তোরাঁটির শুরু থেকেই এই আইটেমগুলো চলছে। রেস্টুরেন্টে খেতে আসা পুরান ঢাকার বাসিন্দা বিনয় পাল জানান, ছোটোবেলা থেকেই তিনি এখানকার আলুর চপের ভক্ত। পার্শ্ববর্তী কে এল জুবিলী স্কুলে পড়াকালীন টিফিন পিরিয়ডে তিন টাকা দিয়ে আলুর চপ কিনতেন। এখন সেই চপ কেনেন ১০ টাকায়। সময়ের পালাবদলে দাম বেড়েছে, কিন্তু স্বাদ বহাল আগের মতোই।
সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রেস্তোরাঁটি খোলা থাকে। প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে ছোটো ছোটো কয়েকটি চেয়ার-টেবিলে ২৫ থেকে ৩০ জনের বসার ব্যবস্থা। সকাল কিংবা সন্ধ্যার নাস্তায় পুরান ঢাকার অধিকাংশেরই পছন্দের তালিকায় রয়েছে এই রেস্তোরাঁ। দুপুরে মধ্যাহ্নভোজে পাউরুটির সঙ্গে ক্রামচাপের স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অনেইে । কেউ আসেন মোরগ-পোলাওয়ের টানে।
ম্যানেজার অনিল মিত্র জানান, তিনি আশির দশকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেশিরভাগ সময় ভিড় লেগে থাকে। যাদের সময় হাতে থাকে, তারা টেবিলে বসেই স্বাদ নেন গরম গরম। কেউ কেউ নেন পার্সেল। তেমনই একজনের সঙ্গে কথা হলো। এসেছেন ধানমন্ডি থেকে। তার চাহিদা ক্রামচাপ ও কাটলেট। আরেকজন অর্ডার দিলেন মোগলাই পরোটা ও চিংড়ি ফ্রাই। একজন জানালেন, পাঁচ প্যাকেট মোরগ-পোলাওয়ের জন্য অপেক্ষায় আছেন ১০ মিনিট ধরে।