একজন শিক্ষককে পালন করিতে হয় গুরুদায়িত্ব। বিশেষ করিয়া প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষকদের হইতে হয় অনেক বেশি সংবেদনশীল ও যত্নবান। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতি থাকিতে হয় পিতৃসম স্নেহ। পিতামাতার ন্যায় ছায়ার মতো হইয়া শুরুটা করাইয়া দিতে হয় শিক্ষা তথা সমগ্র জীবনের। যেহেতু জীবনের প্রথম দিককার ছাপ থাকিয়া যায় সারা জীবনভর, তাই শৈশব অপাপবিদ্ধ ও কুসুমিত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। আর সেইখানেই শিক্ষকের ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে আমাদের সমাজে শিক্ষককে অধিষ্ঠিত করা হয় বিশেষ মর্যাদায়ও। আমরা সকলে পড়িয়া আসিয়াছি কবি কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও তেমন হইতে হয় স্নেহ-সম্মানের। কিন্তু কখনো কখনো ইহার ব্যতিক্রম ঘটিতে দেখা যায়। সম্প্রতি এমনই এক ঘটনা ঘটিয়াছে হবিগঞ্জে। উপজেলার যাদবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন সরকারের ছুড়িয়া মারা বেতের আঘাতে একটি চক্ষু হারাইয়াছে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার। হাবিবা বর্তমানে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। অপারেশন করিয়া তাহার একটি চক্ষু কাটিয়া ফেলিয়া দিতে হইয়াছে। অভিযুক্ত শিক্ষক নিরঞ্জন সরকারকে চাকরি হইতে সাময়িক বরখাস্ত করা হইয়াছে। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্তের জন্য গঠন করা হইয়াছে একটি বিভাগীয় কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাহার বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হইবে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহা একটি ক্রাইম-অফেন্স। প্রশ্ন থাকিয়া যাইবে, ঐ শিক্ষক কী মনে করিয়া শ্রেণিকক্ষে বেত নিয়া প্রবেশ করিলেন, কারণ বেত বা লাঠি লইয়া শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ এখন নিষিদ্ধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আঘাত করাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছে সরকার। এই সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হইয়াছে ২০১০ সালে। কিন্তু সেই কথা জানেন কি সকল শিক্ষক? কিংবা জানিলেও তাহা মানেন কি? যেই শিশুর একটি চক্ষু বাকি জীবনের জন্য অন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহার ক্ষতিপূরণ কখনই সম্ভব নহে। তাই ঐ শিক্ষকের সাধারণ দণ্ডবিধি মোতাবেক যে শাস্তি আসিবে তাহাই তাহার প্রাপ্য।
সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের উপর পড়ালেখার চাপ বাড়িয়াছে। শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাহিরে নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হইতে হইতেছে তাহাদের। কিছুদিন পূর্বে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করিয়াছিল। কিছু স্কুল পরীক্ষার ফলাফল ভালো করিবার জন্য অতি উত্সাহী হইয়া শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক চাপ তৈরি করে। ইহার মীমাংসা প্রয়োজন। স্কুলগুলিকে অযথা প্রতিযোগিতা ত্যাগ করিয়া শিক্ষার্থীদের সহিত সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে হইবে। পাশাপাশি আমরা আশা করিব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার সম্পর্ক হইবে একই সঙ্গে শ্রদ্ধার ও বন্ধুত্বের।