পিতা ছিলেন নিবিষ্ট নিসর্গী, ভালোবাসতেন প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সকল তরুলতা, সংগ্রহ করেন জয়পালের সঙ্গে লবঙ্গলতাও, কিছুটা পক্ষপাত ছিল ভেষজের প্রতি, কেননা এটাই তাঁর পেশা। গোটা বাড়ি গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে গাঁয়ের ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে শুরু করেন। বারোয়ারি কবরস্থানের পাশে তাঁর লাগানো বটগাছটি অনেক বছর টিকেছিল। ডালপালা ছড়ানো সেই মহীরুহ আমরাও দেখেছি। এখন নেই। একটি অশ্বত্থগাছ পুকুরপাড়ে লাগান, পূজাআর্চা চলেছিল মায়ের জীবদ্দশা অবধি, এখন অপাঙেক্তয়। গাঁয়ের মধ্যিখানের কদমতলায় বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর আখড়ায় এক সময় নানা অনুষ্ঠানে প্রচুর লোক সমাগম হতো। পঞ্চাশের গণদেশান্তরে তাতে ছেদ পড়ে। কদমগাছটি তো কবেই হারিয়ে গেছে। গাঁয়ের প্রাচীন একটি তেঁতুলগাছ ঘিরে গড়ে-ওঠা উপকথাগুলি এখন স্মৃতিকথা। দেশে সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটেছে। কয়েক বছর আগে বাড়ি গিয়ে জঙ্গল হয়ে-ওঠা বাগানে ফুলগাছ ছাঁটছিলাম, জমে উঠেছে ফুলসহ ডালপালার স্তূপ, দেখি একটি অচেনা লোক তা থেকে ফুল তুলে প্লাস্টিক ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। জানা গেল সে দূর গ্রাম থেকে দুর্গাপূজার ফুল তুলতে বেরিয়েছে, কোথাও পায়নি। দেখলাম, সে আমার বাগানের একটি ফুলেরও নাম জানে না। টগর, ঘণ্টাফুল, জবা, স্থলপদ্ম—সবই তার অচেনা। আমাদের ছেলেবেলায় গাঁয়ের চাষিবাড়ি জেলেবাড়িতেও ছিল নানা জাতের জবা, বর্ষায় উঠানের কোণভরা দোপাটি, শীতে গাঁদা। আমরা সাজি ভরে তুলতাম।
পিতার বৃক্ষদর্শন আমার জানা হয়নি, কিন্তু তাঁর গ্রন্থসংগ্রহে খানিকটা দখল পেয়েছিলাম। বইপড়া মানসগঠনে সহায়তা যোগায় ঠিকই, কিন্তু ওইটুকুই সব নয়। কুরচি ফুল মেঘদূত পড়ার আগেই চিনতাম। ভিষক পিতার সহকারী ইনাই চাচা এই ফুল কুড়িয়ে এনে উঠোনে শুকাতেন। নরেন্দ্র দেবের অনুবাদ: ‘এই ভেবে সে কুরচি ফুলে/অর্ঘ্য রচি ঊর্ধ্বে তুলে’ এবং পূর্ণ চক্রবর্তীর আঁকা যক্ষের মেঘার্চনের চমত্কার ছবি মনে অবশ্যই মুগ্ধতা জাগিয়েছিল, কিন্তু ইনাই চাচা, দরিদ্র মানুষ, হূদয়ভরা ভালোবাসা, আমার কিশোরমনে গরিবকে ভালোবাসতে পারার যে বীজ পুঁতে রেখে গিয়েছিলেন তা পরবর্তীকালে আমাকে শাস্ত্রীয় কর্মফলবাদের বদলে মার্কসবাদে আকৃষ্ট করেছে। একটা ব্যাপার সম্পর্কে আমি এখন প্রায় নিশ্চিত যে, মানুষকে ভালোবাসতে না শিখলে প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভালোবাসা যায় না, আর তাতে কিছুটা স্বস্তিবোধও করি যে, ভালোবাসাপৃক্ত শিশুমন গড়ার কাজটা সাহিত্যিকদের, আমাদের মতো লেখকদের ভূমিকা পরবর্তীকালীন। আমার জন্য প্রথম কাজটা করে গেছেন শরত্চন্দ্র। ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শোনা বিন্দুর ছেলে, নিষ্কৃতি, মেজদিদি এবং পরে বইতে পড়া, চোখের কত জলই না ঝরিয়েছে। ইন্দ্রনাথ এখন আর ততটা ভাবায় না, কিন্তু সুনন্দ ও অন্নদাদিদিকে ভুলিনি। দ্বিতীয় কাজটি করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও বিভূতিভূষণ। সময় পেলেই পড়ি বনবাণী ও আরণ্যক।
আমি উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষক। একটি বটবৃক্ষের মহীরুহকল্প শরীরের অনুপুঙ্খ বর্ণনা থেকে তার আণুবীক্ষণিক ক্রমোসম পর্যন্ত সবই আমার জানা। কিন্তু ওই বৃক্ষের আরো কিছু তথ্য আছে যেগুলো গাছকে ভালোবাসলেই শুধু জানা যায়। সে হলো তার সৌন্দর্য ও রহস্য। উদ্ভিদবিজ্ঞানী অবশ্যই কবি বা চিত্রী হতে পারেন, আবার কবির পক্ষেও উদ্ভিদবিজ্ঞানী হওয়া সম্ভব। প্রথমোক্তের দৃষ্টান্ত যোশেফ ডালটন হুকার, গাছপালার সঙ্গে চমত্কার নিসর্গচিত্রও আঁকতেন। শেষোক্ত ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ—যাঁর বলাই বা বনবাণী উদ্ভিদবিদ্যার আরেক ধরনের পাঠ যা ওই বিদ্যার শিক্ষকরা শেখান না বা শেখাতে পারেন না। (অংশ)
লেখকের ‘কুরচি তোমার লাগি’ (উত্স প্রকাশন, ২০১২) বই থেকে