রুহানির ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

মাহবুব মাসুম

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাপে-নেউলের সম্পর্ক আর পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুযোগ দিয়েছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার। নিষেধাজ্ঞার কবলে যখন নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা, ইরানে তখন ক্ষমতায় মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। কূটনৈতিক তত্পরতা আর দক্ষতা কাজে লাগিয়ে করে ফেললেন ছয় জাতির চুক্তি। কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ইরানের অর্থনীতিতে বইতে শুরু করে প্রবৃদ্ধির সুবাতাস। এরপর দৃশ্যপটে আবির্ভাব ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ছয় জাতির চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বের করে নেওয়ায় কার্যত অকার্যকর হয়ে যায় এই চুক্তি। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে বহুবার বাদানুবাদ হয়েছে, একে অপরকে দোষারোপ করেছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র স্থল আক্রমণের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিল। সর্বশেষ আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সর্বশেষ ইরানের অবস্থান হচ্ছে, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে আলোচনার টেবিলে বসবে না ইরান। কার্যত মধ্যপন্থি রাজনীতি করলেও এই বৈঠকে বসা ইরানের প্রেসিডেন্টের জন্য কঠিন। এর পেছনে ক্রিয়াশীল কারণগুলোই এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে।

যে-কোনো আলোচনায় যেতে হলে জনমতের ব্যাপারটি একজন গণতান্ত্রিক নেতাকে সবার আগে মাথায় রাখতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৫৩ সালের পর থেকেই ইরানে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবস্থায় হাসান রুহানির আলোচনায় বসাকে জনগণ প্রতারণার শামিল মনে করতে পারে। ইরানে আমেরিকাবিরোধী মনোভাবের পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিল।

প্রথমত, শাহ পাহলভি ইরানের জনগণের ওপর নজিরবিহীন অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছেন। আর সবকিছুর ব্যাপারে সহায়তা পেয়েছেন আমেরিকার কাছ থেকে। ফলে শাহ যতটাই কঠোর হাতে বিরোধীদের দমন করেছিলেন, ততটাই তার প্রতি ঘৃণার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকাবিরোধী মনোভাবকেও বৃদ্ধি করেছে। দ্বিতীয়ত,  ইরানের বিশাল জনগোষ্ঠী রক্ষণশীল। আমেরিকার মদদপুষ্ট হয়ে শাহ পাহলভি নারীমুক্তির যত উদ্যোগ নিয়েছেন, ইরানের জনগণ এটাকে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলেই মনে করেছে। তৃতীয়ত, পাহলভি তেলের ব্যবসা থেকে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বিপুল আয়ের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ইরানের জনগণ এর কিঞ্চিত্ অংশও পায়নি। সৌভাগ্যবশত, জনগণ এই বঞ্চনা আর বৈষম্যের ব্যাপারে সচেতন ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকাবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে উঠতে থাকে। চতুর্থত, গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’ শাহ পাহলভি ব্যবহার করতেন বিরুদ্ধ মতের বিরুদ্ধে। এই বাহিনী সরাসরি শাহের অধীনে ছিল। অধিকারকর্মী, ধর্মীয় নেতাদের ওপর নজিরবিহীন অত্যাচার চালিয়েছে সাভাক। এই বাহিনী আমেরিকার সিআইএ আর ইসরায়েলের মোসাদের মদদপুষ্ট সংস্থা ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবে ভুক্তভোগীরা আমেরিকাবিরোধী মনোভাবের ধারক-বাহক হয়ে ওঠে। পঞ্চমত, বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় সংকুচিত হয়েছে ইরানের অর্থনীতি। পারমাণবিক কর্মসূচির দোহাই দিয়ে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান যে বেকায়দায় পড়েছে, তার সবচেয়ে বড়ো ভুক্তভোগী জনগণই। ষষ্ঠত, সর্বশেষ কোনো সঠিক যুক্তি ছাড়াই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবে আরেক দফা ঘি ঢেলেছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সময়ে ইরানকে ব্যবহার করেছে বিভিন্ন শক্তি। বন্ধু নির্বাচনে এ ক্ষেত্রে ইরানের নেতৃবৃন্দ খুব একটা স্থিতিশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি। অষ্টাদশ আর উনবিংশ শতাব্দীর পুরোটাই কখনো ব্রিটেনপন্থি, কখনো ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াপন্থি নীতি নিয়ে এগিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর বিশাল একটা সময় কেটেছে আমেরিকাপন্থি পররাষ্ট্রনীতিতে। আবার বিপ্লবের পরেই পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে আমেরিকাবিরোধিতা প্রধান ব্যাপার হয়ে গেল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইরান আবার গড়ে তুলেছে নতুন শক্তিবলয়। যে বলয়ে রাশিয়া, তুরস্ক, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ রয়েছে কাতারের মতো দেশ। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় এই শক্তিবলয় ইরানকে কিছুটা ছাড়ের সুযোগ দিচ্ছে। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন উপাদানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সম্পর্ক খুব দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার আশা নেই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়