সরকারের পক্ষ থেকে দেশের মহাসড়কগুলো থেকে টোল আদায়ের ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সড়ক ব্যবহারে টোল দিতে হয়, তাহলে বাংলাদেশে কেন নেওয়া হবে না? টোল থেকে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা দিয়েই সারা বছর সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যয় নির্বাহ করা হবে। শুধু ৪, ৬ ও ৮ লেনের মহাসড়কে টোল দিতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের টোলব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সড়ক-মহাসড়কে টোলব্যবস্থা বহুদিন ধরে চলে আসছে। তবে সাধারণ জনগণের জন্য বিকল্প সড়ক রেখে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এছাড়া টোলযুক্ত মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়িগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়।
সাধারণত বিদেশে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্রিওয়ে নির্মাণের পর টোল আদায় করে সেই টাকা তুলে নেয়। এছাড়া একটি স্টেট বা প্রোভিন্স থেকে অন্য স্টেট বা প্রোভিন্সে প্রবেশ করার সময় টোল দিতে হয় সরাসরি সরকারকে। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম হচ্ছে, সরকার-নিয়ন্ত্রিত সড়কে কোনো টোল দিতে হয় না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার যানবাহনের লাইসেন্স থেকেই ট্যাক্স আকারে সড়ক ব্যবহার বাবদ অর্থ নিয়ে নেয়। যেমন বাংলাদেশ সরকারকেও গাড়ির লাইসেন্স ও তা নবায়নের সময় সড়ক ব্যবহারের ট্যাক্স প্রদান করা হয়। সাধারণত ইউরোপ, আমেরিকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে দুই ধরনের সড়ক ও উড়ালসেতুর ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণ জনগণ সরকারি সড়কে চলাফেরা করে। আর যারা বেশি টাকা ব্যয় করতে সক্ষম, তারা যানজটমুক্ত হয়ে দ্রুত যাওয়ার জন্য বেসরকারিভাবে নির্মিত সড়ক বা উড়ালসেতু ধরে যাতায়াত করে। এজন্য তারা টোল দেয়। কিন্তু সরকারি সড়কের ক্ষেত্রে কোথাও জনগণকে টোল দিতে হয় না। এসব সড়কে কিছুটা যানজট থাকে। সিগন্যাল থাকে। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনার সড়কগুলো মূলত ফ্রিওয়ে। যে সড়কে কোনো সিগন্যাল থাকে না। যা দিয়ে দ্রুত যাতায়াত করা যায়। কারণ বড়ো অঙ্কের টোল গুনে সবাই ফ্রিওয়েতে ওঠে না। যেখানে টোল দিতে হয়, তার আশপাশে অবশ্যই টোলবিহীন বিকল্প সড়কও থাকে, যা দিয়ে সাধারণ জনগণ যাতায়াত করে।
ভারতেও টোলব্যবস্থা আছে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি একই সঙ্গে আমাদের বঙ্গবন্ধু সেতুর চেয়ে সেদেশের অনেক বড়ো বড়ো সেতু সম্পূর্ণ টোলমুক্ত। দুবাই-সিঙ্গাপুরের রাস্তায় টোল দিতে হয়। টোল দিতে হয় জাপানের রাস্তা ও ফ্লাইওভারেও। কোরিয়াতে শুধু টোল দিতে হয় হাইওয়েতে। যারা টোল দিতে না চায়, তারা লোকাল (বিকল্প) রাস্তা নির্বাচন করতে পারে। যানজটমুক্ত অনেকগুলো লেনের কারণে বেশিরভাগ মানুষ এখানে টোল দিয়ে হাইওয়েকেই নির্বাচন করে। এই টাকাটা তারা দেয় বিশেষ সুবিধা ভোগের জন্য।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি, হল্যান্ড ও বেলজিয়ামের হাইওয়েতে কোনো টোল নেই। ইতালিতে হাইওয়েতে টোল আছে কিন্তু বড়ো শহরের মধ্যে ঢুকতে-বেরোতে ১০-২০ কিলোমিটার ফ্রি। যেমন ভেনিস, মিলান। ফ্রান্সেও এমনই। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অধিকাংশ ফ্রিওয়েতে টোল দিতে হয় না। টোলযুক্ত হাইওয়েগুলো করার মূল উদ্দেশ্য হলো, দূরের শহরে যেতে যেন থামতে না হয়, অর্থাত্ ট্রাফিক সিগন্যালমুক্ত রাস্তা। এসব রাস্তায় সর্বোচ্চ গতি ১৩০ কিলোমিটার। পাশাপাশি টোল ফ্রি রাস্তা আছে, যা দিয়ে সব শহরেই যাওয়া যায়। এসব রাস্তাও অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সিগন্যালমুক্ত, তবে সর্বোচ্চ গতিসীমা ৯০ কিলোমিটার।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাসকারী একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইত্তেফাককে জানান, যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দুই ধরনের সড়ক আছে—একটি হাইওয়ে, অন্যটি ফ্রিওয়ে। হাইওয়েতে সিগন্যাল থাকে, কিন্তু ফ্রিওয়েতে থাকে না। ফ্রিওয়েতে টোল দিতে হয়। ফ্রিওয়েগুলো মূলত বাইপাস আকারে থাকে। সরাসরি শহরে প্রবেশ করে না। শহরের পাশে নেমে হাইওয়ে ধরে শহরে প্রবেশ করতে হয়। নিউ জার্সি ও নিউ ইয়র্ক স্টেটকে ভ্যারাইজনি ব্রিজ যুক্ত করেছে। নিউ জার্সি থেকে নিউ ইয়র্ক গেলে ব্রিজের কাছে নিউ জার্সি স্টেট গভর্নমেন্টকে ১৪ ডলার টোল দিতে হয়। আবার নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সি আসার পথে ব্রিজের কাছে ১৫ ডলার টোল দিতে হয়, যা পায় নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্নমেন্ট।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাসকারী একজন প্রবাসী কমিউনিটি নেতা জানান, ওয়াশিংটন থেকে নিউ জার্সি যেতে ম্যারিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভেনিয়াসহ চারটি স্টেট অতিক্রম করতে হয়। প্রতিটি স্টেটের বর্ডারে সংশ্লিষ্ট সরকারকে টোল দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ ধরনের ব্যবস্থা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, অধিকাংশ দেশেই রয়েছে। আর টোল দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে দুই ধরনের ব্যবস্থা ‘ইজি পাস’ (E-Zpass) ও নগদ প্রদান। ‘ইজি পাস’ থাকলে এক্সপ্রেসওয়েতে কোথাও থামতে হয় না। গাড়ির ড্যাসবোর্ডে ‘ইজি পাস’ রাখা থাকে। টোল প্লাজায় স্থাপিত সেনসর সেখান থেকে টাকা কেটে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন :দেশে মহাসড়ক থেকে টোল আদায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টোল আদায়ের আগে মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়িগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে। এজন্য মহাসড়কে ধীরগতি ও দ্রুতগতির গাড়ির পৃথক লেনের দরকার হবে। স্বল্প দূরত্বের গাড়ির জন্য পৃথক সার্ভিস লেনের প্রয়োজন হবে। আর জনগণের টাকায় নির্মিত সড়কে জনগণ চলাচল করবে। সেখানে কেন সরকার টোল আদায় করবে? আর সড়কে যেসব গাড়ি চলে, সব গাড়িই তো সরকারকে ট্যাক্স দেয়। তারা তো প্রকারান্তরে টোল নিয়েই নিচ্ছে।
সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামসুল হক বলেন, ‘মহাসড়কের সেতু ও সড়ক থেকে টোল আদায়ের নিয়ম ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আছে। তবে তা এমনভাবে নয় যে সবাইকে দিতেই হবে। গরিব জনসাধারণের জন্য বিকল্প সড়ক রাখতে হবে। আমাদের দেশে যদি সেবা দেওয়া নিশ্চিত করা হয়, তাহলে আরো কিছু ক্ষেত্রে টোল আদায় করা অযৌক্তিক নয়। তবে একসঙ্গে টোল আদায় করলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বহন করা কষ্টকর হবে। আর এ টোল আদায় করাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজরা সংগঠিত হবে।’
দেশের তিনটি মহাসড়কে টোল আদায় হচ্ছে: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তিনটি মহাসড়কে টোল আদায় করা হচ্ছে। এ তিন মহাসড়কের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী টোলের হারেও ব্যবধান রয়েছে। এর মধ্যে নকলা-হাটিকুমরুল-বনপাড়ার ৫০ কিলোমিটার সড়কে ২০০৩ সালের ১ মে থেকে টোল আদায় হচ্ছে। ২০০৫ সালের ১০ মার্চ থেকে ৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর-শেরপুর অংশে (রুস্তমপুর টোল প্লাজা) টোল আদায় করা হয়। আর ২০০৮ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে টোল আদায় চলছে চট্টগ্রাম পোর্ট একসেস রোডে। মাত্র ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ হওয়ায় এ সড়কে টোলের হারও অনেক কম।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন সেতু এবং ফ্লাইওভারে চলাচলের জন্য যানবাহনের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হারে টোল দিতে হয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় সারাদেশে সড়ক রয়েছে ২১ হাজার ৫৯৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯০৬ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-খুলনা এবং ঢাকা-রংপুর এসব মহাসড়কেই সরকার টোল আদায়ের কথা বলছে।