প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি
কিছুদিন আগে আমি এবং আমার এক বন্ধু আলোচনা করছিলাম, শিক্ষক মানেই হচ্ছে অমূল্য কিছু। আমরা কোনোভাবেই শিক্ষককে ছোটো করে কথা বলার অধিকার রাখি না।
এই আলোচনার দুইদিন পরেই অরিত্রী আত্মহত্যা করে। আচ্ছা অরিত্রীর আত্মহত্যার জন্য কি আমরা একা ওই শিক্ষিকাকে দায়ী করতে পারি? অরিত্রীর মৃত্যুর সময় তার মস্তিষ্কে কি চলছিল আমরা তা জানি না এবং কখনোই জানতে পারবো না। অরিত্রীর জবানবন্দি আমরা কখনো পাবো না। তাই একেকজনে একেক কথা বলেই আমরা শান্ত হবো।
ইদানীং আমরা তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অতিরিক্ত দেখতে পাচ্ছি। এর অবশ্য অনেক কারণ। যেমন ধরুন অরিত্রীর আত্মহত্যার জন্য শুধু শিক্ষিকা একা নয়, দায়ী তার পরিবার এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দূষিত দিকগুলোও।
আমাদের কাছে শিক্ষা মানে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পাওয়া, দামি স্কুলে পড়া, পাবলিক ভার্সিটিতে পড়া। আর পরিবারগুলো যখন শিক্ষার্থীদের নরম ঘাড়ে এসব চাপিয়ে দেয় এবং শিক্ষার্থীরা যখন এসব বহন করতে অপারগ থাকে, তখন জন্ম নেয় নকল, ভর্তি জালিয়াতি, প্রশ্ন ফাঁস এসব।
যেমন ধরুন, ভর্তি জালিয়াতির কথা। প্রতিবছরেই বাংলাদেশের প্রায় স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ঘটনা ঘটছে। আইন যতই জটিল হউক তা বন্ধ হচ্ছে না বরং তা নিয়ম হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর তার সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে নিষ্পাপ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবন। আমি নিষ্পাপ বলতে শুধু ভর্তি হতে না পারা শিক্ষার্থীদের বলছি না, বলছি সেসব শিক্ষার্থীদেরও কথা যাদের ভর্তি বাতিল হয়েছে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির কারণে। সমাজ এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের যদি সুযোগ না দিতো তারা কি কখনো এই বিপথে যেত? তাদের ক্ষেত্রে কখনোই সম্ভব না ৯/১০ লক্ষ টাকা জোগাড় করে ঘুষ দিয়ে ভর্তি হওয়া। অর্থাত্ পরিবারের সম্মতি ও সমর্থনেই তাদের মাথায় ঢোকানো হচ্ছে বিপথে যাওয়ার নির্দেশনা। টাকার জোরে সব হাসিল করা যায় এই সাংঘাতিক কথা যদি এখনই তাদের কচি মগজে প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা করা হয় তাহলে তা অবশ্যই ভবিষ্যত্ বিপদের আগমন বার্তা। কিন্তু এর শুরু কি এখান থেকেই নাকি এটা বীজ থেকেই শুরু। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গোড়া থেকেই চলছে টাকার খেলা। শিক্ষার্থীরা শিশুকাল থেকেই শিখছে টাকাই জীবনের আসল। যার ফলে ঘটছে ভর্তি বাণিজ্যের মতো জঘন্যতম অপরাধ। যা স্বীকার করতে বাধ্য করছে আমাদের পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা। তুমি পাবলিকে পড়লেই তোমাকে শিক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে আর না হলে মূর্খের দলে। সন্তান পাবলিকে পড়ে বললেই চলে খাতির যত্ন অন্যথায় ভিন্নতা। যার ফলে বাবা-মা শিক্ষার্থীদের মনে পাবলিকে পড়তেই হবে সেই চাপ সৃষ্টি করছে। তা যেভাবেই হউক অন্যায় পথে হলেও। তারা এটা বোঝে না সাময়িক মানইজ্জত রক্ষার্থে তারা যা করছে তা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত্ চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের এই জঘন্যতম অপরাধ যখন দেশ ও সমাজের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় তখন তাদের সন্তানকেই কুদৃষ্টিতে দেশের মানুষ চিহ্নিত করে। কারণ নাম শিক্ষার্থীর প্রকাশ হয় শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের নয়। আর এভাবেই শেষ হয় একটি সুন্দর ভবিষ্যত্। এর দায় শুধু পরিবারের নয়, সঙ্গে দায়ী আমাদের সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা আমাদের অন্যতম অধিকার। এই শিক্ষা মানেই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা দামি প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট পাওয়া নয়। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যায় মানে জীবনের সঙ্গে অন্যায়। যা আমাদের ভবিষ্যতে আরো অন্যায় করতে সাহস যোগায়। অন্যায় ঠেকাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতে হবে। পরিবার ও সমাজকে তাদের জঘন্যতম মানসিকতা দূর করতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে উদীয়মান ভবিষ্যত্রা।
n লেখক:শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়