মো. রহমত উল্লাহ
মায়ের বুকের দুধ শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সর্বোত্কৃষ্ট খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত। মাতৃদুগ্ধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় এর সুফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য মায়ের দুধের সমকক্ষ হবার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা রাখে না। তবুও মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার অভিভাবকরা দেদারসে শিশুকে খাইয়ে চলছেন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুর মা মারা যাওয়াসহ যে-কোনো কারণে শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ একান্তভাবে পাওয়া না গেলে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে ঐ শিশুর জন্য স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকারী অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু বাস্তবতা হলো মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক চর্চা বা ধাপ অনুসরণ না করেই ঢালাওভাবে শিশুর জন্য বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচলন দেখা যাচ্ছে যা একই সঙ্গে শিশু, শিশুর পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার জন্যই অকল্যাণকর।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য উত্পাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানো ও বিকল্প শিশুখাদ্যের নির্ভরশীলতা কমাতে বাংলাদেশ সরকারও ইতিমধ্যে সচেষ্ট হয়েছে। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৪; রহিত করে ইতিমধ্যে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এবং এর বিধিমালা ২০১৭ পাশ হয়েছে। আইনে গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়েদেরকে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো, দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার খাওয়ানোর উপকারিতা জানানোর কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও শিশুকে ফরমুলা খাবার খাওয়ানোর কুফলসহ অভিভাবকদেরকে শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি (IYCF) সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুসারে ফরমুলা খাবার বা মাতৃদুগ্ধের বিকল্প যে-কোনো শিশুখাদ্য প্রকাশ্যে প্রচারণা এবং বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিধিমালার ধারা ৪ অনুযায়ী শিশুর জীবন রক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসকরণে একান্তভাবে অপরিহার্য বিবেচিত না হলে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী মাতৃদুগ্ধের বিকল্প কোনো খাদ্যের ব্যবস্থাপত্র প্রদান করতে পারবেন না। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য জীবনরক্ষাকারী অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে যখন জন্মদানকারী মায়ের মৃত্যু ঘটে, বিকল্প কোনো নারীর দুধ খাওয়ানো সম্ভবপর হয়ে না ওঠে অথবা চিকিত্সকের পরামর্শের পরেও মা কোনো কারণে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে অক্ষম হলে। আইনের ধারা ১২(১) অনুযায়ী এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে এবং তজ্জন্য তিনি তিন বছর কারাদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই আইনের যে কোনো অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুসারে বিচারযোগ্য বিবেচিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা আর প্রক্রিয়াজাত মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্যের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধিকতর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য উত্পাদনকারী কোম্পানিসমূহের আইন লঙ্ঘনের অজস প্রমাণ থাকলেও সচেতনতার অভাবে আইনের প্রয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না। আইনের প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সচেষ্ট হতে হবে।
বাংলাদেশে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড়ো বাধা মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্যের প্রচলন বৃদ্ধি এবং উত্পাদনকারী কোম্পানির আগ্রাসি বিপণন পদ্ধতি। বিকল্প শিশুখাদ্য উত্পাদনকারী কোম্পানির মুনাফার পরিমাণ, বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে খানিকটা খাটো করে দেখায় বৈকি। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্যের আগ্রাসন রুখতে না পারলে মাতৃদুগ্ধের সুফল থেকে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বঞ্চিত থেকেই যেতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, মাস্টার্স ইন পাবলিক হেলথ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি