রিতু দত্ত
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ মধ্যপাড়া গ্রানাইট পাথরের মজুতটি ১৯৮৫ সালে আবিষ্কার করলেও ২০০৭ সাল থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এখানে প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় অতি অল্প গভীরতায় গ্রানাইট পাথরের মজুত ১৭ কোটি ৪০ লাখ টন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, যার প্রায় ৪২ শতাংশ উত্তোলন যোগ্য। তাই বলে এখানে যে শুধু উন্নতমানের পাথর পাওয়া যায় তা কিন্তু না, এই খনিতে পাওয়া যায় পাইরাইট। যাকে বলে অতিথিপরায়ণ Host of Gold! ব্যাপারটা একটু স্পষ্ট করা যাক। বাংলাদেশের বেইজমেন্ট রক হচ্ছেই গনিয়াস রক। দিনাজপুরের মধ্যপাড়া থেকে প্রাপ্তই গনিয়াস রককে বলা হয় গ্রানাইট, গ্র্যানোডায়োরাইট (হার্ডরক)। ইগনিয়াস রকের মধ্যে বিদ্যমান পদার্থের মধ্যে সোনা, রুপা, কপার, নিকেল, আয়রন প্রভৃতি ধাতব পদার্থ অন্যতম। গঠন বিন্যাসের দিক থেকে মধ্যপাড়ার ইগনিয়াস রককে প্যাগমাটাইটডাইক বলা হয় যাতে পাইরাইট রয়েছে। আর এই পাইরাইটকে বলা হয়— Host of Gold। সারা বিশ্বে যত স্বর্ণ আহরণ করা হয়, তার অধিকাংশ সংগ্রহ করা হয় Paleo proterozic Granitoids নামের হার্ডরক থেকে। যা দিনাজপুরের মধ্যপাড়ার এই খনির একটি প্রকার।
সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ১ টন পাথর থেকে কমপক্ষে ২.৫ আউন্স স্বর্ণ পাওয়া গেলে তা অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এখন মনে হতে পারে— স্বর্ণ আহরণের জন্য যে ব্যয় হবে তা কাটিয়ে লাভ কতটা পাওয়া যাবে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রতি আউন্স স্বর্ণ সংগ্রহের জন্য খরচ হয় ৫২৮ ডলার যেখানে এর বিক্রয় মূল্য ১২৫০ ডলার। আর মধ্যপাড়ার এই খনি থেকে চলতি বছরের মার্চ মাসে একদিনে রেকর্ড পরিমাণ পাথর উত্তোলন করা হয়, যার পরিমাণ ৬ হাজার ৪৮ মেট্রিকটন। তবে এর গড় উত্তোলনের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৪ হাজার টন। অর্থাত্ এই খনি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এবং সঠিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে স্বর্ণের অস্তিত্ব খুঁজে বের করা অত্যন্ত সহজ হবে। এবং বিস্তর প্রযুক্তি, গবেষণা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে যদি স্বর্ণ উত্তোলন করা যায় তবে এই খাত থেকে বেশ ভালো অঙ্কের তথা ভালো লাভের মুখ দেখা কঠিন কিছু নয়।
এবার আসা যাক এই খনির কঠিনশিলা পাথরের গুণাবলির ব্যাপারে। মধ্যপাড়ার এই খনি থেকে যে পাথর পাওয়া যায় তা অন্য যে কোনো ধরনের পাথরের থেকে উত্কৃষ্টমানের। এই খনি থেকে প্রাপ্ত পাথরের চাপ সহ্য ক্ষমতা ২৪০০০ পিএসআই যা সাধারণ পাথরের ক্ষেত্রে ১৪০০০-১৫০০০ পিএসআই হয়। তাই এই পাথর দিয়ে তৈরি নির্মাণকাজ অনেক বেশি টেকসই এবং মজবুত হয় তা স্বচ্ছ জলের মতো স্পষ্ট। এর আপেক্ষিক গুরুত্বও অন্য সাধারণ পাথরের চেয়ে অধিক বেশি। মধ্যপাড়ার এই খনিতে হতে প্রাপ্ত পাথরের হার্ডনেস ৬.৫ যার ফলে ধুলোবালি বা অন্যান্য উপাদান এর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। ফলে নির্মাণ থাকে অটুট এবং স্থায়িত্ব হয় অনেক বছর। অতি উন্নতমানের এবং দেশে চলমান ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে, যেমন বৃহত্ সেতু, সড়ক ও মহাসড়ক, নদীশাসন, নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে এই কঠিন শিলার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গ্রানাইট হচ্ছে বাড়ি নির্মাণে ব্যবহূত উচ্চমানের কঠিন পাথর। মার্বেল পাথর তৈরিতেও এটি ব্যবহূত হয়। তাছাড়া এই পাথরে সালফার অনেক কম পরিমাণে উপস্থিত থাকে বিধায় একে বলা যায় পরিবেশ বান্ধবশিলা। অর্থাত্ মধ্যপাড়ার এই খনির পাথর গুণে এবং মানে দুটোতেই অত্যন্ত উপযোগী।
মধ্যপাড়ার কঠিন শিলা পাথর উত্তোলনের ক্ষেত্রে অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনের সুনজরের অভাব। কিছুদিন আগে মধ্যপাড়াখনির পাথর উত্তোলন কাজে ব্যবহূত উইন্ডিং মেশিনের গিয়ারবক্সে পিনিয়াম ভেঙে যাওয়ায় উত্তোলন কাজ কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকে। এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি কাজ পরিচালনা করছে না। দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ আছে। এরফলে চুক্তিবদ্ধ সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ পাথর উত্তোলন করে না দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। সর্বোপরি আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাই এসব কর্মকাণ্ড নজরদারি বা তদারক করার দায়িত্বে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে, সেটি পেট্রোবাংলা কিংবা মন্ত্রণালয় হোক, বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে কঠিনশিলা ব্যবহারকারী সংস্থাসমূহে বাংলাদেশের নিজস্ব পাথর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদি ও প্রাচুর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। রাষ্ট্রযন্ত্র সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার করতে না পারে। তবে ইবনে বতুতার কথাই সত্য তা পাবে, বাংলাদেশ দোজখ ই পুরনিয়ামত। তার মানে বাংলাদেশ প্রাচুর্যপূর্ণ নরক।
n লেখক :শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা, বাংলাদেশ