জয় পাল
এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে বাংলাদেশের পেক্ষাপটে শিশুশ্রম একটি সামাজিক সমস্যা। আরেকটু জোর দিয়ে বললে, এটি কেবল সমস্যাই নয় বরং বাংলাদেশের জন্য একটি মস্ত বড়ো গ্লানিও বটে। আর এই সামাজিক সমস্যাটির মূল উত্সভূমিই মূলত দেশে পিছিয়ে পড়া নির্দিষ্ট একটা জনগোষ্ঠীর সীমাহীন দারিদ্র্য।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ মোতাবেক ১৪ বছরের কম বয়সি যে কোনো ছেলেমেয়েকে কার্যক্ষেত্রে নিয়োগ করাটাই শিশুশ্রমের আওতায় এবং এটি রীতিমতো একটি অপরাধ। কিন্তু আইন প্রয়োগ করেও বন্ধ হয়নি শিশুশ্রম প্রথা। কেমন করেই-বা বন্ধ হবে, যেখানে দরিদ্রতার কশাঘাতে আজও জর্জরিত দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২১ দশমিক ৮ শতাংশ; সেখানে ক্ষুধার তাড়নায় ছোট্ট শিশুকেও যে ঘরের বাইরে কাজে যেতে হয়। লাঞ্ছিত হতে হয় কর্মক্ষেত্রে! কেবলই জীবন ধারণের নিমিত্তে, অন্ন-বস্ত্রের আশায়। এমন উদাহরণ হয়তো দেশে অনেক আছে, যেখানে দরিদ্রতার ক্লেশে জর্জরিত একটি ভঙ্গুর পরিবারকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে স্কুলের বারান্দা ছেড়ে কোনো একটি শিশুকে পাড়ি জমাতে হয়েছে কোনো এক কারখানার বারান্দায়। একজন শিশু ছাত্রকে হতে হয়েছে শিশু শ্রমিক!
ভাগ্যের পরিহাসের এখানেই শেষ নয়। কর্মক্ষেত্রে এই শিশু শ্রমিকটিকে হতে হয় নানাভাবে নির্যাতিত। অনেক সময়ই বয়স উপযোগী কাজ না পেয়ে, করতে হয় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ফলে শিশুপ্রাণটিকে ব্যবহার করা হয় অতি তুচ্ছভাবে। কাজ শেষেও প্রায়ই ন্যায্য মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয় শিশুশ্রমিকদের। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতন। প্রায় ক্ষেত্রে অধীনস্থ মালিকের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। মেয়েশিশু শ্রমিকের বেলায় বিষয়টি আরো বেশি মর্মান্তিক। যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় মেয়েশিশু শ্রমিককে।
সাম্প্রতিক কালে, সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের কার্যকরী উদ্যোগের ফলে শিশুশ্রমিকদের হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও একে সমূলে উত্পাটন করা আজ অবধি সম্ভব হয়নি। সত্য বলতে, গোটা দেশের ছোটো-বড়ো প্রায় সব নগর-মহানগরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এই দুঃখী শিশু শ্রমিকেরা। বিশেষত দেশের মহানগরীয় এলাকাগুলোতে ওদের প্রকোপ খুবই বেশি। মহানগরের অলিগলিই যেন অধিকাংশ শিশু শ্রমিকের কর্মসংস্থানের মূল প্রাণকেন্দ্র!
দেশে শিশুশ্রমিক সৃষ্টিতে বিভিন্ন কারণ ক্রিয়াশীল থাকলেও এর উল্লেখযোগ্য প্রধান কারণ যে দারিদ্র্য তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই দারিদ্র্য শ্রেণির লোকদের অধিকাংশই নিজেদের অধিকার বিষয়ে অজ্ঞ ও অসচেতন। তা ছাড়া তাদের মধ্যে রয়েছ বিবিধ কুসংস্কার ও অজ্ঞতা, রয়েছে শিক্ষার অভাব, উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং তারই ফলে সীমাহীন দারিদ্র্য। আর এ দারিদ্র্যই যেন বাধ্য করে শিশু-কিশোরদের শ্রমে নিযুক্ত হতে।
শিশুশ্রম বিষয়টি যেহেতু একটি দেশের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, তাই দেশকে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত করা ছাড়া শিশুশ্রমের নিপাত সাধন আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তাই শিশুশ্রম বন্ধে প্রথম ও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে দেশে দরিদ্র শ্রেণির জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নতি সাধন। অন্তত তারা যেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সার মতো মৌলিক অধিকারগুলো প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়। যেন সমাজের প্রতিটি শিশু পায় সুষ্ঠু বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। আর তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়, আমাদের সকলের। আমাদের এই বিষয়টি মনে রাখার বিশেষ প্রয়োজন যে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত্। কাজেই আমরা দেশের অদূর ভবিষ্যেক শিশুশ্রমের কবলে এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারি না। তাই শিশুশ্রম বন্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য সচেষ্ট হওয়ার প্রয়োজন। আর তা সম্ভব কেবল আমাদের সকলের একান্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট