ইত্তেফাক ডেস্ক
আজ ১০ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। মুক্ত এলাকায় উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
জামালপুর:মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক অধিনায়ক ইউসুফ আলীর নির্দেশে ৮ ডিসেম্বর বিকালে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা জামালপুরের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। জামালপুরে ছিল পাকসেনাদের চরম শক্তিশালী দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। তাই বেশক’টি কোম্পানি এবং মিত্রবাহিনীর সদস্যরা একত্রিত হয়ে জামালপুর সদরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রথমে মিত্রবাহিনীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে মৃতঞ্জয়ী খেতাবপ্রাপ্ত বীর প্রতীক মুন্সি জহুরুল হক নিজের জীবন বাজি রেখে আত্মসমর্পণ পত্র হাতে নিয়ে ক্যাম্প কমান্ডার কর্ণেল সুলতান খানের কাছে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) ক্যাম্পে চিঠি পাঠান। পরে আত্মসমর্পণে অস্বীকার করলে দূত বীর প্রতীক মুন্সি জহুরুল হককে গাছের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে অবশেষে শরীরে টাইম বোমা বেঁধে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পাড়ে ফেলে দেয় পাকসেনারা। পরদিন দুপুরে ভারতীয় দুইটি বোমারু বিমান এসে পিটিআই পাকসেনা ক্যাম্পে মুহুর্মুহু বোমা বর্ষণ করতে থাকে। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর ওই দিন পাক-হানাদার বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে শত্রুমুক্ত করে জামালপুর সদর।
মাদারীপুর:’৭১ সালের এই দিনে সদর উপজেলার সমাদ্দার ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধা, পাকসেনা ও তাদের দোসরদের সঙ্গে একটানা ৩৬ ঘন্টা সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ সংবাদে মুক্তিকামী মানুষের কাছে পৌঁছালে বাঁধভাঙা জোয়ারের মত জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসে আনন্দ উল্লাস করে। খলিল বাহিনীর প্রধান খলিলুর রহমান খানের নেতৃত্বে সংগঠিত সম্মুখযুদ্ধে অন্তত ২০ হানাদার সেনা নিহত হয়। ৮ম শ্রেণির ছাত্র সরোয়ার হোসেন বাচ্চু শরীফ পাক হানাদারের গুলিতে ঘটনাস্থলে শহীদ হয়।
নড়াইল :এইদিনে মিত্রবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া নড়াইলের বীর মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী এবং মুক্তিপাগল দামাল ছেলেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী মিলিশিয়া বাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে নড়াইলকে মুক্ত করে। দিবসটি পালনের জন্য নড়াইলের জেলা প্রশাসন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, চিত্রা থিয়েটারসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দিনব্যাপী পৃথক পৃথক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নড়াইলে পাঁচজন খেতাবপ্রাপ্তরা হলেন: বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ, বীরউত্তম মুজিবুর রহমান, বীর বিক্রম আফজাল হোসেন, বীরপ্রতীক খোরশেদ আলম ও বীরপ্রতীক মতিয়ার রহমান।
রায়পুরা (নরসিংদী):এদিনে সেক্টর কমান্ডার বীরউত্তম ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদের কবল থেকে গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনে। রায়পুরা থানার পূর্বাঞ্চল ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় ৬ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী ব্যারিকেড ও প্রতিরোধ ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তুমুল আক্রমণ চালায়। ৭ নভেম্বর পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ রণাঙ্গনে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে শহীদ হন চট্টগ্রাম রাউজানের সুবেদার বশর, রায়পুরা মরজাল গ্রামের সার্জেন্ট আঃ বারি, খাকচক গ্রামের এয়ারফোর্সের নূরুল হক, রাজনগর গ্রামের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সোহরাব। ৯ ডিসেম্বর ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্ট ও ১৮ রাজপুত রেজিমেন্ট রায়পুরায় পৌঁছে এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হয়। ফলে রায়পুরায় অবস্থানরত পাকসেনারা নরসিংদী হয়ে ঢাকার দিকে পলায়ন করে এবং রায়পুরা মুক্ত হয়।
রাণীনগর (নওগাঁ): বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বরের বাকি আর ছয়দিন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাণীনগরবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় দিন। আজকের এইদিনে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা হানাদারমুক্ত হয়। স্বাধীনতার সংগ্রামে সাড়া দিয়ে সারা দেশের ন্যায় এই উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৯ ডিসেম্বর রাণীনগর পাক-হানাদার মুক্ত করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারা থানা সদরে থাকা হানাদার ক্যাম্প চারিদিক থেকে ঘেরাও করেন। পরদিন ভোরে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে উভয়পক্ষে গোলাগুলির এক পর্যায়ে ১৭ জন রাজাকার অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। এই সময় পাকবাহিনী সান্তাহার অভিমুখে পালিয়ে যায়।
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল):এইদিনে পাকহানাদারের কবল থেকে মুক্ত হয় ঘাটাইল। কাদেরিয়া বাহিনীর নেতৃত্বে যমুনা নদীতে পাকিস্তানী যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস করা হয়। এ সময় মুক্তিসেনারা ২১ কোটি টাকার গোলাবারুদ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কব্জা করে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। ৭ ডিসেম্বর ভুঞাপুর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় ৮ ডিসেম্বর রাত্রেই ঘাটাইলের প্রতিটি পাকবাহিনীর অবস্থানে একযোগে আক্রমণ করা হবে খোদ কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে। ৮ ডিসেম্বর একটি কোম্পানি রতনপুর অবস্থান নেয়। এ সময় ৩০/৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক দল বানিয়াপাড়া সেতুর পশ্চিম পাশে তেলেঙ্গাপাড়া গ্রামে অবস্থান নেয়। পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ৯ ডিসেম্বর ভোর চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত চতুর্দিক থেকে বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঘাটাইল থানা আক্রমণ করেন মুক্তিবাহিনীরা। মুক্তিযোদ্ধারা বানিয়াপাড়া সেতু, কালিদাসপাড়া সেতু দখল করে ঘাটাইল থানার দিকে অগ্রসর হন। এ যুদ্ধে ৫০ জন পাকহানাদার নিহত ও ১৫০ জন বন্দী হয়। এইদিন সম্পূর্ণরূপে ঘাটাইল হানাদারমুক্ত হয়।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ):পাকবাহিনী ’৭১-এর ২৩ এপ্রিল জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে মুক্তাগাছায় প্রবেশ করে। শহরের বিভিন্নস্থানে গুলিবর্ষণ লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগে শহীদ হন অসংখ্য জনতা। যুদ্ধকালীন রফিজউদ্দিন, ডা. বাবর আলী, জবেদ আলীও আব্দুর রাজ্জাক এই চারটি কোম্পানি পাকহানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। অপরদিকে মকবুল হোসেন পাবনা ও টাঙ্গাইল এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি কোম্পানি গঠন করে। মুক্তিযোদ্ধারা খতম করে বহু রাজাকার ও পাকবাহিনীর সদস্যকে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তাগাছাকে মুক্ত করেন।