তেঁতুলিয়ায় এক বছরের শিশুসহ নির্দোষ মাকে গ্রেফতারের অভিযোগ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় এক নির্দোষ মাকে তার এক বছরের সন্তানসহ গ্রেফতার করার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।  চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের প্রেমচরনজোত গ্রামে।

এছাড়া নিরপরাধ এক ব্যক্তিকে আটকের পর ৫০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী লিখিত অভিযোগ করেছে। এ বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেলে পঞ্চগড় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর আব্দুল মান্নান ও তার সঙ্গীয় ফোর্সের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। এলাকাবাসী এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অভিযোগ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে একটি দল জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার সীমান্ত এলাকা প্রেমচরণজোত এলাকার লিটনের বাড়িতে অভিযান চালায়। লিটন বাড়িতে না থাকায় তারা ঘরে তল্লাশি শুরু করে। এ সময় তারা বাড়ির ভেতরে থাকা লিটনের মা মঞ্জুমা বেওয়া (৭০), লিটনের স্ত্রী ঝর্না বেগম, খাজা নাজিমউদ্দিনকে চড়-থাপ্পড় মারে। এক পর্যায়ে তারা লিটনের স্ত্রী ঝর্না বেগমের কোমরে একটি ওয়ান সুটার পিস্তল 'খুঁজে' পায়। পরে ঝর্না ও তার এক বছরের শিশু সন্তানকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। সোমবার রাতে তেঁতুলিয়া মডেল থানায় লিটন ও ঝর্নাকে আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা করে।

তবে লিটনের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে লিটনকে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন তার স্ত্রীকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। এমনকি অভিযানের সময় লিটনের সেজ ভাই নিরপরাধ খাজা নাজিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে জোরপূর্বক গাড়িতে তুললে উদ্যত হয়। পরে ওই পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। টাকা দাবি করায় লিটনের বড় ভাই মানিক মিয়া পুলিশের ৯৯৯ ও দুদকের ১০৬ নাম্বারে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তারা। পরে হঠাৎ লিটনের স্ত্রী ঝর্না বেগমকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয় তারা।

লিটনের বড় ভাই মো. মানিক মিয়া, মো. বাবুল এলাকাবাসী মো. হানিফা, মো. দুলাল, মনিরুজ্জামান ওমর জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে লিটন ও তার মা দুজনই ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গত রবিবার রাতে তারা দুজনে বাড়ি ফেরেন। সোমবার আকস্মিক এই অভিযান চালানো হয়। 

মামলায় অভিযুক্ত লিটন বলেন, 'আমি ১০ দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হই। আমার সঙ্গে আমার মা ও স্ত্রী ছিল। আমরা রবিবার রাতে আমরা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসি। সোমবার আমি বাইরে ছিলাম। পরে শুনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে আমার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। মাদক না পেয়ে পিস্তল দিয়ে ফাঁসিয়ে আমার শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে তারা। আমি যদি কোন অপরাধ করতাম, তাদের কাছে যদি কোন প্রমান থাকতো তাহলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতো। কিন্তু আমার শিশু সন্তানসহ নিরাপরাধ স্ত্রীকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো!'

লিটনের ভাই খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন, 'কর্মকর্তারা মাদক কোথায়, মাদক কোথায় বলে চিৎকার করে আকষ্মিক বাড়িতে ঢুকে নারী ও বৃদ্ধাদের চড় থাপ্পর মারতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা আমাকে ধরে হাতে হ্যান্ডকাপ লাগায়। এক লাখ টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দিতে পারে বলে তারা জানায়। পরে আমার ভাবি (উম্মে কুলসুম স্বামী-বাবুল) ৪৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবেশি মনিরুজ্জামান ওমর ৫ হাজার টাকাসহ মোট ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে নেয়। আমি মাদক তো সেবন করি না বিড়িও খাই না।'

লিটনের বড় ভাই মানিক মিয়া বলেন, 'যখনি আমি শুনছি তারা টাকা দাবি করছে আমি তাদের টাকা দিতে নিষেধ করি। এমনকি আমি ৯৯৯ ও ১০৬ এ ফোন করেও অভিযোগ করি। কিন্তু কোন সাড়া পায়নি। পরে আমার ছোট ভাই ৫০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্ত হয়। আমার ভাই যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তারা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাক আমাদের কারো কোন আপত্তি নেই। কিন্তু নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার করা এটা কোন আইন। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার দাবি করছি এবং নিরাপরাধ আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে মিথ্যে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।'

লিটনের মা মঞ্জুমা বেওয়া বলেন,  'আমরা রবিবার রাতে হাসপাতাল থেকে ফিরলাম মাত্র আর তারা এসে তল্লাশি শুরু করলো। মহিলা পুলিশটা আমার বৌমার গায়ে হাত তুলেছে। হঠাৎ তারা বলে বসে আমার বৌমার কাছে অস্ত্র আছে। অস্ত্র কোথা থেকে এলো কেউ বলতে পারে না। এটা ওদেরই কারসাজি।'

পঞ্চগড় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক আব্দুল মান্নান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'তারা যেসব অভিযোগ করছে তা মিথ্যে। লিটন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তালিকাভূক্ত মাদক কারবারি। আমরা তার বাসায় অভিযান চালাই। ভুলক্রমে আমরা তার বড় ভাই খাজা নাজিম উদ্দিনকে আটক করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেই। কিন্তু তল্লাশির সময় লিটনের স্ত্রী ঝর্নার কোমরে একটি ওয়ান সুটার গান খুঁজে পাই। পরে লিটন ও তার স্ত্রী ঝর্নাকে আসামি করে আমি বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা করি।'

আরও পড়ুন: পাঁচবিবিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুজনের মৃত্যু

তেঁতুলিয়া মডেল থানার ওসি জহুরুল ইসলাম বলেন, 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছে একটি পিস্তল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি ভারতে তৈরি। এই পিস্তলে একটি গুলিই ব্যবহার করা যায়। এ বিষয়ে থানায় একটি মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তারকৃত ওই নারীকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।'

ইত্তেফাক/নূহু