পদ্মা অয়েলে অসন্তোষে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন

পদোন্নতি, পদায়ন ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে। এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, বিমান সেবায় ঠিকমত জ্বালানি সুবিধাও দিতে পারছে না। জ্বালানি সরবরাহ না করায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সিডিউলও বিপর্যস্ত হচ্ছে। এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোম্পানিটিতে চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

সূত্রমতে, সরকারি এই তেল কোম্পানিতে বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির রাহুগ্রাস চেপেছে। কতিপয় কর্মকর্তার লাগামহীন দুর্নীতির কারণে আর্থিক ক্ষতিতে পড়ছে কোম্পানিটি। দুদক কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করলেও অধরা রয়ে গেছেন অনেকেই। ফলে, ক্রমেই বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ বিমান, এমিরেটস, থাই এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারসহ অন্যান্য কোম্পানির এয়ারক্রাফটে জ্বালানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় পদ্মা অয়েল কোম্পানি। যা যাত্রীদের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসবের মূলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নানা গ্রুপের কারসাজি। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনার প্রতিকার না করে বরং দায়ী ব্যক্তিদের পদোন্নতি ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেয়ায় কোম্পানির সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। যা নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে কোম্পানির অভ্যন্তরেই। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ী করা হয়েছে এমন ব্যক্তিরাও পার পেয়ে গেছেন। কোন কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগও আনা হয়েছে। তবু ব্যবস্থা না নেয়ায় সবই চলছে ফ্রি স্টাইলে। অভিযোগ রয়েছে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি সাধনের পরও পদোন্নতির সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছেন কেউ কেউ। এ নিয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরেই চলছে চরম অসন্তোষ। যোগ্যরা বঞ্চিত হলেও অযোগ্যরা ঠিকই পদোন্নতি পাওয়ায় এই ক্ষোভ বেড়েছে। এমনকি কোন কোন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রকল্প পরিচালকও নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এই পদে নিয়োগ পেয়ে কোম্পানিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্বজনপ্রীতি ও যথাযথ নিয়ম না মানার অভিযোগ উঠেছে। দুদকের অভিযুক্তদের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শাস্তির বদলে পুরস্কার দেয়ায় কোম্পানির অভ্যন্তরে যেমন ক্ষোভ বেড়েছে, তেমনি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর আগে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে জেট ফুয়েল হইড্রেন্ট লাইন নির্মাণে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলাও হয়। এতে আসামি ছিলেন কোম্পানির সাবেক এমডি আবুল খায়ের, প্রকল্প পরিচালক আলী হোসেন ও ম্যাক্সওয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের এমডি ফাহিম জামান পাঠান। এছাড়া, খুলনার দৌলতপুরে তিনতলা অফিস ভবন নির্মাণ কাজে ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাতেও অপর একটি মামলা দায়ের করেন দুদক কর্মকর্তারা। এতে আসামি করা হয় প্রকল্প পরিচালক নুরুল আমিন, কর্মকর্তা আবদুর রহিম, সালেহিন আহমেদ আক্কাস ও ইউনুস এন্ড কোম্পানির মালিক আনিসুর রহমানকে। 

মংলার এক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক মোসাদ্দেক হোসেন কোম্পানির এজিএম থাকা অবস্থায় আট কোটি সাতান্ন লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ’৯৯ সাল পর্যন্ত সময়ে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়। তখন গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মাহমুদ উল ইসলাম এবং সদস্য ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তারা তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন, মোসাদ্দেক হোসেন কোম্পানির আট কোটি সাতান্ন লাখ টাকা ক্ষতির জন্য দায়ী। তিনি পদোন্নতির জন্য গত ১০ এপ্রিল ১৮ তারিখে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বরাবর আবেদন করলে তা নাকচ করে বলা হয়, এই আবেদন সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা পরিপন্থী। এরপরও কোন কিছুরই তোয়াক্কা না করে পদোন্নতি দেয়া হয় এবং খুলনায় তাকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ ধরনের নানা ঘটনায় কোম্পানিটির গতি হ্রাস পাচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এসব ব্যাপারে জানতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।