চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিস থেকে ল্যাপটপ গায়েব এবং রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার তিন আসামিকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিএমপি কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া গতকাল বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি ইত্তেফাককে জানান, গ্রেফতার তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। বিচারক মামলার প্রধান আসামি জয়নালকে তিন দিনের এবং অপর দুই আসামি বিজয় দাস ও তার বোন সীমা দাস ওরফে সুমাইয়াকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
রাজেশ বড়ুয়া বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, কীভাবে তারা রোহিঙ্গাদের এনআইডি দেওয়ার মতো দুঃসাহসিক ও রাষ্ট্রবিরোধী তত্পরতায় লিপ্ত হয়েছিল। তাদের পেছনে কোনো রাঘব বোয়াল আছে কি না। তারা যতই শক্তিশালী হোক, খুঁজে বের করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
এদিকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার নির্বাচন কমিশনের কর্মী জয়নাল আবেদীন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র করে দেওয়ার কন্ট্রাক্ট নিতেন বলে নির্বাচন কার্যালয় ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, এনআইডি তৈরির কাজটা জয়নাল বাসায় বসেই করতেন। জয়নালের সঙ্গে সাগর ও সত্য সুন্দর নামে দুই জনের পরিচয় ছিল, যারা একসময় ঢাকায় এনআইডি প্রকল্পে কাজ করতেন। পরিচয়ের সূত্র ধরে সাগরের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় একটি ল্যাপটপ কেনেন জয়নাল। প্রতি শুক্র, শনিবার ও বন্ধের দিনে জয়নাল তার অফিস থেকে (জেলা নির্বাচন কার্যালয়) ডিএসএলআর ক্যামেরা, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড গোপনে নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন। বাসায় বসে তিনি ল্যাপটপের সঙ্গে সেসব সরঞ্জাম জুড়ে রোহিঙ্গাদের যাবতীয় তথ্য সাগরের কাছে পাঠাতেন। সাগর নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে অবৈধভাবে ঢুকে তথ্য আপলোডসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রিন্ট কপি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জয়নালের কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, জয়নালের এক মামা ছিলেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার মাধ্যমে জয়নাল ও তার ১৬ জন আত্মীয় নির্বাচন কমিশনে বিভিন্ন পদে চাকরি পেয়েছেন। ২০০৪ সালে তিনি অফিস সহায়ক হিসেবে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্প শুরু হলে তিনি বিভিন্ন কাজ রপ্ত করে নেন। ঐ সময় তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারে ঢুকে তথ্য পরিবর্তনের কাজ শিখে নেন। প্রথম দিকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম, জন্ম তারিখসহ ছোটোখাটো সংশোধনগুলো করে দিতেন। পরে তিনি রোহিঙ্গাদের ভোটার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। অফিসে উগ্র আচরণের কারণে জয়নাল অন্তত ১০ বার চট্টগ্রাম নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে শাস্তিমূলক বদলি হয়েছেন। তবে বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে তিনি আবার চট্টগ্রামে চলে আসতেন।
ইসি সার্ভারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন :নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন কমিশনের সার্ভারের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা আসা শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে আরো সতর্কতার প্রয়োজন ছিল। সার্ভারের পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকার সুযোগ নিয়েই একটি দুষ্ট চক্র রোহিঙ্গাদের এনআইডি ইস্যু ও সংশোধনের নামে রমরমা বাণিজ্য শুরু করার দুঃসাহস পায়।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের গঠিত বিশেষ তদন্ত টিমের সদস্য এবং চট্টগ্রামের নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এগুলো হচ্ছে লাইসেন্স করা ল্যাপটপগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং যে কোনো পর্যায়ের ইসি কর্মীর সার্ভারে প্রবেশকে নিয়ন্ত্রণে আনা। এ দুটি কাজ শুরু থেকেই কঠোরভাবে মনিটরিং করা গেলে রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়া ঠেকানো যেত বলে তারা মনে করছেন।
ইসির প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ইসির নিবন্ধিত ল্যাপটপগুলো লাইসেন্স করা সফটওয়্যারভুক্ত। এটা অফলাইন সিস্টেমে কাজ করে না। মূল সার্ভারের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই। তবে উপজেলা পর্যায়ে ল্যাপটপগুলোতে কাজ করা হয় ইন্টারনেট মডেম দিয়ে। সেই মডেম সংযুক্ত করলে সার্ভার সচল হয়। তখন সরাসরি ইনফরমেশন ইনপুট দেওয়া যায়। রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার জন্য তথ্যও এই প্রক্রিয়ায় সার্ভারে ইনপুট দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো জানান, রোহিঙ্গাদের এনআইডি প্রাপ্তির ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর এনআইডির কাজে নিবন্ধিত ইসির সব ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড ও আইপি পরিবর্তন করা হয়েছে। ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে ল্যাপটপগুলো অথেনটিকেট করা হয়েছে।