সামনে জাতীয় সংসদের রংপুরের একটি আসনের উপনির্বাচন। গত জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের সর্বশেষ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে এবং দেশের বাইরেও যে আগ্রহ আর পাশাপাশি উত্কণ্ঠা ছিল, এবারের উপনির্বাচনে তা শূন্যের কোঠায়। কারণও আছে। এই নির্বাচনে কে হারলো আর কে জিতল তা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা নেই। এই একটি আসনের জয় পরাজয়ে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনো হেরফেরও হবে না। এই উপনির্বাচনকে নিয়ে যা কিছু আগ্রহ তার মূলে প্রয়াত হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। রংপুরের এই আসনটিতে টানা বেশ কয়েকবারের এমপি ছিলেন তিনি। আসনটি শূন্য হয়েছে তার মৃত্যুতে।
যা হোক, এরশাদের মৃত্যুর পরপরই জাতীয় পার্টিতে আরেকদফা ভাঙনের আওয়াজ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছিল। বিষয়টা সামনে চলে আসে তার মৃত্যুর পর জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নির্ধারণ করতে গিয়ে। দেবর-ভাবি একেবারে মুখোমুখি চলে আসেন এই উপনির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ভাঙনের দৃশ্যপট যখন চূড়ান্ত, আমার ধারণা আমার মতো যে কেউই যখন জাতীয় পার্টির আরেকদফা ভাঙনের পক্ষে চোখ বন্ধ করে লাখ টাকার বাজি ধরতে রাজি, ঠিক তখনই আমরা দেখলাম জাতীয় পার্টির নেতৃত্বের প্রজ্ঞা আর সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ায় তাদের দৃঢ়তা। বিবদমান প্রতিটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে গেলেন দেবর-ভাবি।
এই উপনির্বাচনকে নিয়ে আরো একবার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে আওয়ামী লীগও। দীর্ঘদিন ধরে এরশাদের দখলে থাকা আসনটিতে নিজেদের নিয়মিত প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। নির্বাচনের বেলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রজ্ঞা আমরা গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই দেখেছি, দেখলাম এবারও। এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুরের অধিকাংশ ভোটার এই আসনের পরবর্তী এমপি হিসেবে এরশাদের পরিবারের কাউকেই প্রত্যাশা করবেন—এমনটাই প্রত্যাশিত। আবেগপ্রবণ বাঙালি আবহমান চরিত্রের সঙ্গে তেমনটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উপনির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপিও। পিপিপি বলে ২০ দলীয় জোটের একটি নাম সর্বস্ব দল বিএনপিতে বিলীন হয়েছে এই নির্বাচনকে সামনে রেখে। দলের নেত্রী রিটা রহমান বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। বিএনপির এই সিদ্ধান্ত যেমন আমার কাছে বোধগম্য নয়, তেমনি বোধগম্য নয় রংপুরের ভোটারদের কাছেও। আমরা বরাবরই দেখেছি বিএনপি যেকোনো মূল্যে ২০ দলীয় জোটের ২০-এর হিসাবটা ঠিক রাখে। অতীতে যখনই কোনো দল জোট ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, তখনই তারা যেভাবেই হোক ঐ দলের নাম কাওয়াস্তে নেতাদের দিয়ে কোনো মতে একটা দল করে ২০ দলে ২০টি দল ঠিক রেখেছে। অথচ এবারের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০ দলীয় জোট এখন ১৯ দলীয় জোটে পরিণত হয়েছে। তার চেয়েও বড়ো কথা কে এই রিটা রহমান। গত জানুয়ারিতে এই আসনে ধানের শীষ পেয়েছিলেন তিনি, তবে তখন জোটের প্রার্থী হিসেবে। যতদূর জানি, তিনি কখনই বিএনপি করেননি, বিএনপির জন্য তার কোনো ত্যাগ নেই, নেই মাঠে কোনো অবস্থানও। রংপুরের ভোটাররা তো দূরের কথা এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীরাও তার পক্ষে মাঠে নামতে নারাজ। রিটা রহমানের একটা যোগ্যতা অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিদের অন্যতম আনোয়ার পাশার স্ত্রী। এই একটি পরিচয়ই সম্ভবত তাকে দফায় দফায় ধানের শীষ এনে দিচ্ছে।
একটা সময় ছিল যখন আমরা বিরোধী দল বলতে বিএনপিকেই বুঝতাম। সে সময়টা এখন শুধুই স্মৃতি। গত দুটি জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আবার অংশ নিয়েও বারবার তাদের কাছে গোল খেয়েছে বিএনপি। এবার জাতীয় পার্টি ভাঙনের মুখে পড়লে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের তকমাটি ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বের প্রজ্ঞায় তেমনটি ঘটেনি।
মাঠের রাজনীতিতে এখনো জ্বলছে বিএনপির প্রদীপ। জাতীয় পার্টি এখানেও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু হারাতে পারেনি এখনো। তবে ইদানীং মাঠের রাজনীতিতে বিএনপির যে একের পর এক ভুল, খুনির স্ত্রীকে মনোনয়ন দিয়ে যার আবারও বহিঃপ্রকাশ তাতে কেন যেন মনে হয় বিএনপি ভুলে গেছে ডারউইনের সেই অমোঘ ত্বত্ত, ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’। সম্ভবত প্রবাসী নেতার হাত ধরে পরবাসী দলেই পরিণত হতে চলেছে তারা।
n লেখক :চিকিত্সক