অণুগল্প

জব্বার দারোয়ান

আবুল কাসেম

 

অনেকগুলো বহুতল ভবন নিয়ে একটি আবাসন গড়ে উঠেছে এখানে। চারিদিকের সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করা। একটি মস্তবড়ো ফটক। পাহারায় চব্বিশ ঘণ্টা দারোয়ান। সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত। বাইরের কাউকে নাম লিখিয়ে তবেই ভেতরে ঢুকতে হয়। এ-রকম কঠিন নিয়মবাধা।

এখানে বসবাসকারীরা আশপাশের মানুষজনের মতো নয়। এখানকার জীবনমান উঁচু। চালচলন উঁচু। এদের চলাফেরা-পোশাক-আশাকও উঁচু। সবাই নাকউঁচু স্বভাবের। বাহ্যিক দিক দিয়ে এরা অভিজাত। বৈষম্যভরা মন। এদের আভিজাত্যটা সর্বগ্রাসী।

কয়জন দ্বাররক্ষী আছে এখানে। ওরা চাকরি করে। দারোয়ানের চাকরি। দ্বারের দু’পাশে দুজন সর্বক্ষণ পাহারায়। বসার টুল আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ বসতে পারে না। দাঁড়িয়ে শুধু হাত কপালে ঠেকায়। সারাক্ষণই ওঠবস করে। দিনে-রাতে দুই পালা। একাধারে বারো ঘণ্টা। রাতে ঘুমহীন বারো ঘণ্টা পাহারা। বড়ো কষ্টের চাকরি। টাকা কম। মাত্র কয়েক হাজার মাসে। ওভারটাইম নাই। ওরা অধিকারহীন। নানাভাবে অভাবগ্রস্ত, বিপন্ন ওরা; কেউ নদীভাঙায়, কেউ অসুখ-বিসুখে, কেউ কুসঙ্গ দোষে। ওদের উত্সব-পালা-পার্বণ সবই দুঃখভারাক্রন্ত। সুযোগসন্ধানী বিত্তশালী কোম্পানি ওদের দাস বানিয়ে রেখেছে।

জব্বার দারোয়ান। ওর তিনটি সন্তান। স্বামী-স্ত্রী মিলে ওরা পাঁচজন। একটি বস্তিতে থাকে। অস্বস্তি ও অশান্তির দিন ওর। সংসার চলে না। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এই ক’দিন আগে, ছোট মেয়েটি চিকনগুনিয়ায় মারা গেছে। মেয়েটি মারা যাওয়ার আগে কোম্পানির কাছে কিছু টাকা চেয়েছিল ও। পায়নি। সেই থেকে জব্বারের মন ভালো নেই। সবকিছুতে নিরাসক্ত। মেয়েটি মারা যাওয়ার পর ওর হতাশা বেড়েছে। কেননা মেয়েটি চিকিত্সাহীন অবস্থায় মারা গেছে। ওর কান্নাকাটিতে কিছুই হয়নি।

এখানকার আকাশছোঁয়া দালানকোঠা ওর ক্ষুদ্রতাকে জানান দেয় শুধু। বিত্ত-বৈভবের আস্ফাালন ওকে বেশি কাবু করে। প্রাচুর্যে ভরা পরিবেশ। এখানকার সুন্দর নাদুসনুদুস বাচ্চাগুলো দেখে ও হীনম্মন্যতায় ভোগে। সর্বদা নিজের অসহায়ত্ব আর বউ-বাচ্চার করুণ মুখচ্ছবি ওকে যারপরনাই বিমর্ষ করে। ওর অন্তরাকাশকে মেঘাচ্ছন্ন রাখে।

জব্বারও একদিন চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়। চিকিত্সাধীন সময়টা ওর জন্যে আরো হতাশা ও করুণ অবস্থার সৃষ্টি করে। দীর্ঘকালীন চিকিত্সা ওর জন্যে মোটেও সুখকর নয়। চাকরিটা থাকা না-থাকা নিয়ে ও যথেষ্ট সন্দিহান হয়ে পড়ে।