ফলপ্রসূ ও কার্যকরী স্বাস্থ্যব্যবস্থা

আমিনুল হক শাহীন

স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া মানুষের অধিকার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বের অর্ধেক মানুষ এখনো পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৭৪তম সাধারণ অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। এ অধিবেশনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সবার অংশগ্রহণে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মানসে এই অধিবেশনেই এক উচ্চপর্যায়ের মিটিং অনুষ্ঠিত হবে; যাতে সরকারপ্রধান, রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্যখাতের নেতৃবৃন্দ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কল্পে যারা কাজ করছেন, তারা অংশগ্রহণ করবেন।

‘ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্যতম অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি, যাতে প্রতিটি মানুষের যে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যসেবা, যখন যেখানে যতটুকু প্রয়োজন এবং কোনো রকম অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়া, পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী তার সদস্য রাষ্ট্রদের মধ্যে একটা ফলপ্রসূ ও কার্যকরী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়। এই সভায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশ ও স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘোষণাও আশা করা হচ্ছে।

অধিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভুটান, সূচনা ফাউন্ডেশন, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব ও তাত্পর্য তুলে ধরতে এক সাইড ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। ঐ সাইড ইভেন্টে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভুটানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটায় শেরিং উপস্থিত থাকবেন। ইভেন্টটিতে বেশ কিছু বিশ্ববরেণ্য জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মূল্যবান বক্তব্য দেবেন। আর মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড উইল অ্যাম্বাসাডর এবং সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ হোসাইন।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়। ব্যাপারটা এমন যে, শরীরটাকেই ঠিক রাখতে পারি না তো মন দিয়ে কী হবে? কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সমন্বিত শারীরিক, মানসিক এবং রিহ্যাবিলিটেটিভ (পুনর্বাসনমূলক) স্বাস্থ্যসেবার অন্তর্ভুক্তি যে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালে কাজের চাপ কমায়—এটা আজ প্রমাণিত। অপর্যাপ্ত ও অপ্রতুল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরোক্ষভাবে এবং ঘটনার পরম্পরায় ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিত্সা খাতে ব্যয় ও বোঝা বাড়িয়ে দেয়। সে কারণেই মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রতিটি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোর জন্য অবশ্য কর্তব্য। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে এ ধরনের সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা সাইড ইভেন্টের আয়োজন অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতের বড়ো বড়ো সংস্থা বা উন্নত বিশ্বের বড়ো বড়ো দেশগুলোর মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হবে, যা থেকে প্রকারান্তে লাভবান হবে আমাদের মতো দেশগুলো।

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের কিছু অর্জন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশ ইপিআই কর্মসূচিতে সফলতা দেখিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে পোলিও মুক্ত ঘোষণা দিয়েছে, জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি খুব সুন্দরভাবে শ্লথ করেছে। বাংলাদেশ সরকার দেশজুড়ে জনগণকে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে, যা জনসংখ্যার অনুপাত হিসেবে প্রতি ৬ হাজার লোকের জন্য একটি এবং এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সমভাবে সারা দেশে বিস্তৃত। এই কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবহার করেই বাংলাদেশের সামপ্রতিক সময়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্য এসেছে—এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

অপরদিকে সায়মা ওয়াজেদ হোসাইন তার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজর্ডার ফিল্ডে একজন রিসোর্সফুল পারসন হিসেবে ইতিমধ্যে নিজেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নিজে একজন অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের অটিজম এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজেবিলিটিবিষয়ক ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি বোর্ডের চেয়ারম্যান। তার প্রতিষ্ঠিত মানসিক স্বাস্থ্য এবং সূচনা ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যথেষ্ট প্রশংসনীয় কাজ করেছে। ভুটানে, নেপালে এবং আরো অনেকগুলো দেশে সূচনা ফাউন্ডেশন সফল কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি সূচনা ফাউন্ডেশন বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যোগ্য হয়ে ওঠা সায়মা ওয়াজেদ হোসাইন ও তার সূচনা ফাউন্ডেশন যদি যুগপত্ভাবে কাজ করে তবে আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্যখাত বা নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষের চিকিত্সা ও পুনর্বাসনেই শুধু উন্নয়ন হবে না, পুরো স্বাস্থ্য খাতই উপকৃত হবে, যার সুফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।

n লেখক :যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিত্সক ও গবেষক