বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর সরকারি উদ্যোগ যেমন আছে, তেমনি ভাসানচরে তাদের পুনর্বাসনের কার্যক্রমও চলছে পুরোদমে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চীন মধ্যস্থতা করতে সম্মত হয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের তিন দফা শর্ত পূরণে অগ্রগতি না থাকায় প্রত্যাবাসন অনেকটাই অনিশ্চিত। পক্ষান্তরে সরকার রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কিন্তু তাদের পুনর্বাসন তথা খাদ্য, চিকিত্সা, বাসস্থান এমনকি জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
প্রত্যাবাসনে চীন মধ্যস্থতা করতে সম্মত হলেও তিন শর্ত পূরণ না হলে তারা স্বদেশে ফিরতে নারাজ। এর মধ্যে একটি হচ্ছে নাগরিকত্ব প্রদান, ভূমির অধিকার ও নিরাপদ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এসব শর্ত এখন পর্যন্ত মেনে নেয়নি।
সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল বলেন, সরকারের লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন। তবে স্থানসংকুলান কষ্টসাধ্য হওয়ায় তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাতে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয় তদারক করতে সুবিধা হবে। ভাসানচরে পুনর্বাসনসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আশ্রয়ণ প্রকল্প-৩ বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৫১ সালে যে আইনটি দুই দেশের নাগরিকদের চলাচলের জন্য ছিল, সেটির কার্যকারিতা এখন আর নেই। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা ৬০ হাজার নবজাতকের জন্ম দিয়েছে। ২৭ হাজার নারী এখন অন্তঃসত্ত্বা।
কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক বর্তমান সচিব এবং বিআরডিবির মহাপরিচালক মো. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বার্মার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে ১৯৫১ সালের। এই চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশের নাগরিকেরা পণ্য আনা-নেওয়া ও সাধারণ কাজে যাতায়াত করতে পারে। বাংলাদেশের টেকনাফ ও মিয়ানমারের মংদু সীমান্তের সীমান্তরক্ষীদের দেওয়া পাশ নিয়ে তারা কায়োকখালী ঘাট দিয়ে যাতায়াত করতে পারে।
সাবেক ঐ জেলা প্রশাসক আরো জানান, ২০১২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তিনি ঐ আইন বাতিলের প্রস্তাব করলেও তা কার্যকর হয়নি। অবশ্য ২০১৭ সালে বলপূর্বক মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পাশ প্রথা স্থগিত রেখেছে।
পুনর্বাসনকাজের অগ্রগতি :সম্প্রতি ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ভাসানচরে নেওয়া প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন, অগ্রগতি ও রোহিঙ্গাদের সেখানে পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে ভাসানচরে প্রায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প-৩ গ্রহণ করা হয় ২০১৭ সালে। আসন্ন নভেম্বর মাসে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৪৪০টি ঘর নির্মাণ শেষ হয়েছে। ১২০টি সাইক্লোন শেল্টারের মধ্যে ১০০টির কাজ শেষ হয়েছে। ৪০ কিলোমিটার রাস্তা, দুটি আন্তর্জাতিক মানের হেলিপ্যাড নির্মাণও শেষ হয়েছে। এছাড়া তিনটি সিকিউরিটি হাউজ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণে চারটি ওয়্যারহাউজ নির্মিত হয়েছে। এক মেগাওয়াট সোলার হাইব্রিড প্ল্যান্ট ও ১ মেগাওয়াট ৫০০ কিলোওয়াটের দুটি ডিজেল জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে। ৮টি হাইস্পিডর বোট চীনে নির্মাণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ১ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস ও তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সব ধরনের কর্মসূূচিও নেওয়া হয়েছে। এনআরসি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থনান্তরের আগে ৫৫টি শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে ৪৫টি শতভাগ পূরণ হয়েছে। বাকি ১০টি শর্ত পূরণের কাজ চলছে।