সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ হইতে শুরু করিয়া অবসর গ্রহণ পর্যন্ত গোটা চাকুরিকালীন জীবনে নানা বিধিবিধান অনুসরণ করিতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অধস্তনদের চাকুরিবিধি সঠিকভাবে মানা হইতেছে কি না, তাহা নজরে রাখিয়া থাকেন। সরকারি চাকুরিতে যাহাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হউক না কেন, তাহার দালিলিক প্রমাণ থাকে। অর্থাত্, কাগজপত্রের বাহিরে কিছু হইবার সুযোগ নাই। কিন্তু কোনো কোনো বিষয়ে জনস্বার্থে সামান্য ব্যত্যয় ঘটিবার সুযোগও রহিয়াছে। সেই ব্যত্যয়ের সুযোগ যখন অনিয়ম হইয়া দাঁড়ায় অথবা চোখে পড়িবার মতো হয়, তাহা মানিয়া লওয়া যায় না। ইহার মধ্যে অন্যতম হইল সরকারি, বিশেষ করিয়া রাজস্বভুক্ত কর্মচারীদের বদলি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০১৫ সালের জুলাই মাসের এক পরিপত্রমতে, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে রাজস্ব প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের একই পদে কিংবা একই কর্মস্থলে তিন বত্সর মেয়াদ পূর্ণ হইলে বদলির রেওয়াজ রহিয়াছে। বাস্তব অবস্থাভেদে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনস্বার্থে একজন কর্মচারীকে তিন বত্সরের কম অথবা খানিকটা বেশি সময় নিয়োজিত রাখিয়া থাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করিয়া জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ব্যতীত অন্যান্য মন্ত্রণালয়ভুক্ত দপ্তরে ইহাকে অনিয়ম বলিয়া বিবেচনা করা হয় না। একজন কর্মচারী তিন বত্সরের স্থলে জনস্বার্থে চার বা পাঁচ বত্সরও থাকিতে পারেন। কিন্তু একজন কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে, বিশেষ করিয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, গণপূর্তসহ কয়েকটি বিভাগে একই পদে ২০ বা ২৫ বত্সর কিংবা ততোধিক সময় চাকুরিতে নিয়োজিত থাকাটা কেবল অস্বাভাবিকই নহে, বরং ইহা অনিয়মেরই অংশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন দপ্তরে এইরকম বেশ কিছু কর্মচারী-কর্মকর্তা রহিয়াছেন, যাহারা তিন বত্সর পার করিয়া ১৫-২০ বত্সর কাটাইয়া দিতেছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সুযোগে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গড়িয়া উঠিতেছে সখ্য, এমনকি আত্মীয়তাও; যাহা দুর্নীতির পথ সুগম করিতে পারে। কর্মকর্তা নিজেও স্থানীয় বাসিন্দার মতো হইয়া যান। অথচ সরকারি চাকুরির বিধি অনুসারে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা নিজ এলাকায় পোস্টিং লইতে পারেন না। যেই সকল বিভাগে আর্থিকভাবে লাভবান হইবার সুযোগ রহিয়াছে, সেই সকল ক্ষেত্রে এত দীর্ঘকাল অবস্থান মোটেই গ্রহণযোগ্য নহে। উল্লেখ্য, কেবল চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নিজ জেলায় শূন্য পদ থাকা অথবা স্টেশন থাকার শর্তে মানবিক বিবেচনায় আবেদন করিতে পারেন, অর্থাত্ চাকুরি করিতে পারেন।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলি, বিশেষ করিয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত ও গণস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নজর রাখিতে হইবে। কারণ এই সব বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়মিত সংস্কারমূলক কাজ হইয়া থাকে এবং উক্ত বিভাগগুলির সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতিতে জড়াইয়া পড়িবার সুযোগ বেশি থাকিয়া যায়। প্রায়শই স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির সম্পর্ক গড়িয়া উঠিতে দেখা যায়। সুতরাং এই সব বিভাগ অন্য কিছু বিভাগের চাইতে অধিক স্পর্শকাতর বৈকি।