রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ

আবুল কাসেম ফজলুল হক

গোটা ঐতিহাসিক কালব্যাপী সর্বত্রই দেখা যায় মানুষের জীবনের সঙ্গে তার ভাষার কিংবা নিজের ভাষার সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ভাষা ছাড়া জীবনযাপন চলে না। মানুষের আত্মবিকাশের একপর্যায়ে তার জীবনের বিমূর্ত অঙ্গ রূপে দেখা দিয়েছে ভাষা।

দেখা যায়, জীবন যেখানে উন্নত, ভাষাও সেখানে উন্নত। এবং ভাষা যেখানে উন্নত, জীবনও সেখানে উন্নত। ভাষার উন্নতি সাধিত হয় ভাষার জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির এবং জাতীয় উন্নতির মধ্য দিয়ে। নিজের ভাষাকে উন্নত না করে কোনো ব্যক্তি কিংবা জাতি উন্নতি করতে পারে না। যে ব্যক্তি ভাষায় নিপুণ, সমাজে তার সাফল্য ও মর্যাদা বেশি।

আরো দেখা যায়, ভাষা ও জ্ঞানবিজ্ঞান আর জ্ঞানবিজ্ঞান ও ভাষা অবিচ্ছেদ্য। সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ইত্যাদি সৃষ্টির পেছনেও কাজ করে চিন্তা বা ভাষা। চিন্তা আগে না ভাষা আগে—এ নিয়ে বিতর্ক আছে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে। মানুষ ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, ভাষা আয়ত্ত করে। ভাষা আয়ত্ত করার এবং ভাষাকে বিকশিত করার সামর্থ্য মানুষের আছে। ইতিহাস জুড়ে মানুষকে এক অবস্থায় দেখা যায় না। মানুষ হয়ে-ওঠা প্রাণী। এই হয়ে-ওঠার বা উন্নতির প্রক্রিয়া চলমান। পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ত্রিয়ার, সেই সঙ্গে সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্য দিয়ে মানুষ বর্তমান অবস্থায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মানুষের এই হয়ে-ওঠার বা উন্নতির মূলে আছে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনের ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি। চিন্তাই ভাষা, ভাষাই চিন্তা। চিন্তা ছাড়া ভাষা হয় না, ভাষা ছাড়া চিন্তা হয় না।

আদিতে মানুষের ভাষা ছিল না, মানুষই ভাষা সৃষ্টি করেছে। আদিম মানুষেরা যৌথ জীবনযাত্রার ও প্রকৃতির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয় নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের জৈবিক সামর্থ্যের বলে নিজেদের ভাষা সৃষ্টি করেছে। প্রয়োজনের তাগিদেই তারা তাদের ভাষাকে বিকশিত ও উন্নত করে চলেছে। কেবল বাক্যন্ত্রের ক্রিয়া দিয়ে ভাষার মর্ম বোঝা যায় না। ভাষার সঙ্গে মানুষের গোটা অস্তিত্ব ও পরিবেশ জড়িত থাকে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবন প্রয়াসে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে ভাষা সৃষ্টিতে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ, জাপানি, সংস্কৃত, হিব্রু, লাতিন, আরবি, ফারসি, বাংলা, উর্দু প্রভৃতি ভাষার ইতিহাস যতই সন্ধান করা যায়, ততই এটা বেশি করে বোঝা যায়। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীরই ভাষা সৃষ্টি করার মতো জৈবিক সামর্থ্য নেই। মানুষের মতো ক্রামগত নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে উন্নত করার সামর্থ্যও আর কোনো প্রাণীর নেই।

দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এমন মাত্র দুইশ ভাষা দুনিয়ায় আছে। এসব ভাষা বিকাশমান। এগুলোর মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান ওপরের দিকেই আছে। এগুলো ছাড়া বিভিন্ন মহাদেশে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী আছে। তাদেরও আলাদা আলাদা ভাষা আছে। তবে তাদের ভাষা বিলীয়মান।

বাংলাদেশে পঁয়তাল্লিশটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর পঁয়তাল্লিশটি বিলীয়মান মাতৃভাষা আছে। এই পঁয়তাল্লিশটি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের সামান্য বেশি। এরা জন্মের পর থেকেই নিজেদের ভাষার মতো বাংলা ভাষাও শেখে। এদের বলা যায় দ্বিভাষিক। বাংলা ভাষাকেই তারা উন্নতির অবলম্বন মনে করে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের এবং বাংলাদেশেরও বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে ইউনেস্কোর প্রচার ও কাজ বাস্তবতাবিরোধী। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের লোকেরা জীবনযাত্রার ও উন্নতির প্রয়োজনে নিজেদের ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রভাষা শিখছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের উন্নতির সম্ভাবনা। বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নতির ও মানবজাতির মূলধারায় আসার সুযোগ সর্বত্র বাড়াতে হবে। তাদের চিরকাল আদিবাসী করে রাখার নীতি বর্জনীয়।

আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও উদ্দেশ্য থেকে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এর দ্বারা রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে এবং রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোর উন্নতির জন্য রাষ্টভাষা বাংলার উন্নতিকে স্থগিত রাখা ঠিক হবে না। নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টিতে আমাদের এগোতে হবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারা ধরে।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশন,  এনজিও ও ইউনেস্কো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নয়নের জন্য যে পথ প্রদর্শন করে, যেসব পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চালায়, অনেক সময় সেগুলো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নতির অন্তরায় হয়। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহকে নিজেদের উন্নতির জন্য পার্শ্ববর্তী বৃহত্ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে রাষ্ট্র গঠন করতে হয় এবং রাষ্ট্রভাষা শিখতে হয়। তারা যদি বাইরে থেকে কিছুই গ্রহণ না করে এবং কেবল নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রা নিয়ে চলে, তাহলে তারা কোনো কালেই উন্নতি করতে পারবে না।

মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র ভাষা (state laugage) দ্বারা কেবল অফিসের ভাষা (official laugage) বোঝায় না। বোঝায় তার সঙ্গে আরো অনেক কিছু। রাষ্ট্রভাষার মধ্যে অফিস চালানোর ভাষা আছে। সেই সঙ্গে আছে জাতীয় জীবনে জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা। আছে কোনো জাতির আর্থসামাজিক, রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভাষা। রাষ্ট্রভাষার উন্নতি হলে রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাতির সভ্যতা উন্নত হয়।

কোনো ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি বিকাশশীল থাকলে সেই ভাষা বিকাশলী থাকে। কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীই তার বিলীয়মান মাতৃভাষা নিয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদীরা সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার প্রচার চালিয়ে বাংলা ভাষার আর্থ

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের বিলীয়মান কোনো মাতৃভাষাকেই বাংলা ভাষার সমপর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব নয়।

আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও উন্নতি অপরিহার্য। চলমান বহু ঘটনা আছে, যেগুলো দেখে বলা যায় যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা না টিকলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকবে না। দেশ থাকবে; মাটি, মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, নদীনালা ও আকাশ-বাতাস থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে না। যারা বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার বদলে ইংরেজি চান, তারা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করবেন?

দেশ ও রাষ্ট্র এক নয়; দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। আমাদের রাষ্ট্র না থাকলে কেবল দেশ থাকলে আমরা কি ভালো থাকব? নিজেদের রাষ্ট না থাকলে আমরা কি স্বাধীন থাকব? ১৯৭১ সালে কেন আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছিলাম? ছয় দফা আন্দোলনে কেন আমরা যোগ দিয়েছিলাম? কেন আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছিলাম? কেন আমরা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম? বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাদ দিলে এসব চাওয়া অর্থহীন হয়ে যায়।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাঙালি চরিত্র লক্ষ করে ১৯৭৩ সাল থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকে থাকার মতো নয়। তারা জোর দিয়েছেন বাঙালি চরিত্রের নিকৃষ্টতায়। তাদের যুক্তি ও মত কখনো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সবাই তাদের সন্তানদের ঐ সব রাষ্ট্রের নাগরিক করেছেন। আমি সব সময় বাঙালি চরিত্রের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেছি। আমি সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি, বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা যাবে।

একুশে ফেব্রুয়ারিকে উদ্যাপন করতে হবে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’রূপে। রাষ্ট্রভাষা দিবস উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবচেতনা সৃষ্টি করতে হবে।

১৯৭২ সালে বিলুপ্ত করা বাংলা উন্নয়ন বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং একটি স্বতন্ত্র জাতীয় অনুবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ বিদ্যা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে ইতিহাস অবলম্বন করে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত সব বিষয়ের সঙ্গে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান প্রগতিশীল রাষ্টবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, নীতিবিদ্যা ও দর্শন অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃহত্ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী করেছেন। বড়ো দুই রাজনৈতিক দল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কথা না ভেবে দূতাবাস অভিমুখী রাজনীতি নিয়ে চলছে। বাংলাদেশের সব প্রচারমাধ্যম ১৯৮০-র ও ৯০-এর দশকে বিবিসি রেডিওর অনুসারী হয়ে কাজ করেছে। বিরোধী দলগুলোও তাই করেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে বড়ো দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সুষ্ঠু, আবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাহায্যের আবেদন নিয়ে ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতেও স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে সাহায্য চাইতে যান। তারা চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যও দলীয় পরিচয় নিয়ে কোনো কোনো নেতা নিউ ইয়ার্কে জাতিসংঘের হেড অফিসে গিয়ে তদবির করেন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থ সংস্থাগুলো ‘দাতা সংস্থা’ ও উন্নয়ন সহযোগী নাম দিয়ে বাংলাদেশর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে যুক্ত হয়। উচ্চ ও উচ্চ-মধ্য শ্রেণির লোকেরা সরকারি ও সরকারবিরোধী—উভয় মহল তাদের ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলেছেন। মন্ত্রিপরিষদ জাতীয় সংসদ, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায় বিচারব্যবস্থার উচ্চপর্যায় শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চপর্যায় লক্ষ্য করলেই এটা বোঝা যায়। বাংলাদেশে একদিকে আছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিল ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ও-লেভেল এ-লেভেল, অপর দিকে আছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত ইংলিশ ভার্শন—এ সবই বাংলাদেশের ভূভাগে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। বাংলাদেশের ভূভাগে রাষ্ট্র গঠন করতে হলে অনেক কিছুরই অমূল পরিবর্তন লাগবে।

বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার  এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশর রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করার পথে বিরাজিত অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে। তার জন্য নতুন সংকল্প দরকার। যারা দ্বৈত নাগরিক, যাদের স্ত্রী বা স্বামী অথবা সন্তান দ্বৈত নাগরিক কিংবা বিদেশি নাগরিক, তারা যাতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, উপমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, উপসচিব থেকে সচিব, জজকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে না পারেন, সংবিধানে তার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখতে হবে। বিধান এমন হবে যে কারো অন্য রাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণে কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক হলে দ্বৈত নাগরিক কিংবা স্ত্রী বা স্বামী বা সন্তান অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক (দ্বৈত নাগরিক) হলে কেউ বাংলাদেশে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নতির জন্য বাঙালি জনগোষ্ঠীর উন্নতি স্থগিত রাখা যাবে না। আদিবাসীদের চিরকালের জন্য অদিবাসীরূপে রাখার সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার রেড ইন্ডিয়ানদের এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের শত শত বছর ধরে যেভাবে রাখা হয়েছে তা অন্যায় এবং তা গোটা পৃথিবীর আদিবাসীদের কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের জন্য কার্যকর নীতিরূপে থাকা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট দিয়ে কোনো কাজের কাজ হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি পরিবর্তন করতে হবে।

বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনগর্ঠিত করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্তদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নীতিতেও আটল থাকতে হবে।

n লেখক :প্রগতিশীল চিন্তাবিদ