বাঁচতে হলে বাঁচাতে হবে প্রকৃতি

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সবুজ সুশোভিত ষড়ঋতুর দেশ নামে খ্যাত বাংলাদেশের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা যেমনি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, তেমনি ঠান্ডাও অনভূত হচ্ছে বেশি। বেড়ে গেছে নানা রোগের সংক্রমণও। ঋতুচক্রে দেখা দিয়েছে বিশাল হেরফের। আগের মতো এখন আর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে যথাসময়ে ঋতুর আবির্ভাব ঘটছে না। ঋতুর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ব্যতীত অন্যসব ঋতুর আমেজ উপভোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বিলম্বিত হচ্ছে শীত, বর্ষার আগমন অথবা অসময়ে ভারী বর্ষণ কিংবা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যে  কোনো এলাকা মরুকরণের প্রাথমিক আলামতই হচ্ছে এসব। আর এ আলামতটি পরিলক্ষিত হচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশেই।

দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল নামে খ্যাত নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবহাওয়ায় মরুময়তার লক্ষণ অন্যসব এলাকার তুলনায় বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ একটা সময়ে এ অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরদশেক ধরে গ্রীষ্মকালে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং শীতে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। গত শীত মৌসুমে তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি চলে গিয়েছে, আর গত গ্রীষ্মে ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করেছিল। উল্লেখ্য, কোনো এলাকা মরুকরণের জন্য বৈরি আবহাওয়ার সঙ্গে ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই যথেষ্ট। উদহারণস্বরূপ বলা যায়, উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত ‘সোনোরান’ মরুভূমির কথা। এটি উত্তর আমেরিকার শুষ্ক ও উষ্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। গ্রীষ্মকালে সেখানকার তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বাত্সরিক গড় বৃষ্টিপাতও তেমন সন্তোষজনক নয়। সোনোরান মরুভূমির তাপমাত্রার পরিসংখ্যান মোতাবেক বলা যায়, আমাদের দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের তাপমাত্রা তারচেয়ে ভয়ানক। রক্ষা পেয়েছে শুধু বৃষ্টিপাত এবং যত্সামান্য বনজ সম্পদের কারণে। এখানে  সোনোরান মরুভূমির তুলনায় বৃষ্টিপাত একটু বেশি বিধায় মরুকরণ প্রক্রিয়া খানিকটা বিলম্বিত হচ্ছে। জলবায়ুর সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দৃষ্টি দিলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এটি আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য মহাবিপদ সংকেত।

বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ নিয়ে বিশ্বের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। তারা সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছেন বাংলাদেশকে। মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানী ড.নারম্যান ম্যাকলিয়ও যিনি সাহারা মরুভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, তিনি জানিয়েছেন, ‘সাহারা মরুভূমি শুরু থেকে যেভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়েছে, ঠিক একই কায়দায় বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বাতাসেও সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে’। মার্কিন ভূ-বিজ্ঞানীর দেওয়া এ তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আমরা জানি, মরুকরণ প্রক্রিয়া তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটে না, খুব ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়। কারণ একবার মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও দেখা যায়, এটি পরিপূর্ণতা পেতে অর্ধশতাব্দী বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। ফলে মানুষের মাঝে বিতর্ক লেগেই থাকে। অর্থাত্ মরুকরণের পরিপূর্ণতা দেখে যেতে হলে একটা মানুষের জীবদ্দশায় তা সম্ভব হতে না-ও পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু বাংলাদেশই নয়, সমগ্র বিশ্বেই এর প্রভাব পড়ছে। বিশ্বে প্রতি মিনিটে ৪৪ হেক্টর আবাদী ভূমি এবং ২০ হেক্টর বনভূমি মরুকরণ হচ্ছে। সেই হিসাব মোতাবেক দেখা যায়, বছরে ৭০ লাখ হেক্টর জমি মরুকরণ হচ্ছে। মরুকরণের প্রভাবে উত্তর আমেরিকার ৪০ শতাংশ আবাদি ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে সাহারার দক্ষিণ অংশে গত ৫০ বছরে ছয় লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি গ্রাস করে নিয়েছে মরুভূমি। জাতিসংঘের তথ্য মোতাবেক জানা যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতি বছর বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুকরণ হচ্ছে। এ জন্য দায়ীও মানুষ। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানত দায়ী হলো ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো। তবে অন্যরাও দায় এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। বড় বড় শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদী শাসন ইত্যাদির ফলে দারুণভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে।

মেরু অঞ্চলের বড় বড় বরফের চাঁই গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে মরুকরণ হচ্ছে পর্যাপ্ত জলের অভাবে। দুই মেরুর বরফ গলার ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও মালদ্বীপ, মুম্বাই, ইন্দোনেশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, মার্শাল আইল্যান্ড, মিশরের ব-দ্বীপ অঞ্চল, টোকিও, লন্ডন, নিউইয়র্ক ও ভিয়েতনামের উপকূলীয় শহর সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দু’ভাবেই আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমত, দেশের দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে। দ্বিতীয়ত, দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে জল সংকটের কারণে। অর্থাত্ জল বৃদ্ধি এবং জল হ্রাস দু’টি সমস্যাই এ দেশের জন্য প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের পথ একটাই; বন-বনানী-বন্যপ্রাণী, জলাধার ও পর্বতশ্রেণি সংরক্ষণ করা। তবে যদি রক্ষা হয় সবুজ সুশোভিত এ বাংলা।

n লেখক: কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ