‘প্রাণ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের মাঝে চিরকাল বাঁচিয়া থাকিবার আকুতি প্রকাশ করিয়াছেন এইভাবে, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তাহাই তো, এই অপূর্ব সুন্দর পৃথিবী হইতে চিরতরে চলিয়া যাইতে কে চাহে? জন্মিলে মরিতে হইবে বটে, তবে অমরত্বের প্রত্যাশাও কেহ ত্যাগ করে না। এইজন্য পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই তাহার নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ছাপ রাখিতে চাহেন। সেই ছাপের মধ্যে তিনি নিজেকে পরিব্যাপ্ত রাখিতে চাহেন তাহার অবর্তমান সময়ে।
অমরত্ব লাভ করিবার মানসে প্রাচীনকালে রাজা মহারাজারা বিভিন্ন ‘কেমিস্ট’ নিয়োগ করিতেন অমৃতসুধা আবিষ্কারের জন্য। প্রাচ্য হইতে পাশ্চাত্য—সকল জনপদের মহাপ্রতাপশালী সম্রাটরা নিজেদের অমর করিতে কী না করিয়াছেন! কিন্তু মহাকালের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে সবাইকে বিলীন হইয়া যাইতেই হয়। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বসিয়া নাই মানুষের অমরত্বকে বিচিত্র উপায়ে দান করিতে। বর্তমানে এক কম্পিউটার হইতে অন্য কম্পিউটারে তথ্য আপলোড করিবার বিষয়টি অতি সাধারণ। বিজ্ঞান বলিয়া থাকে, মানুষের মস্তিষ্কও একটি তথ্যভান্ডার। সুতরাং যদি এমন দিন আসে যে নিজের মস্তিষ্কটা কম্পিউটারে আপলোড করিয়া নেওয়া হইল! তাহার পর উহা সুবিধামতো সংরক্ষণও করা হইল! কাটপেস্ট বা কপিপেস্ট কিংবা ডিলিটের কাজ চলিল সামান্য ক্লিকের বা টাচের মাধ্যমে! তাহা হইলে ব্যাপারটি কেমন হইবে? কেমন মানে, কেমন ভয়ংকর কিংবা সুবিধাজনক হইবে? কেন ‘ভয়ংকর’ অথবা কেন ‘সুবিধা’র প্রশ্ন আসিতেছে—তাহা একটু চিন্তা করিলেই বুঝিয়া নেওয়া যায়। শোনা যাইতেছে, কম্পিউটারে মানুষের মস্তিষ্ক আপলোড করিবার প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিবে আর মাত্র তিন দশকের মধ্যেই। শুধু তাহাই নহে, কল্পবিজ্ঞানের মতো, ভবিষ্যতে রোবটের সঙ্গেও জুড়িয়া দেওয়া যাইবে মানুষের মস্তিষ্কও। ফলে ডিজিটাল অমরত্ব পাওয়া সম্ভব হইবে বলিয়া মনে করেন আধুনিক অনেক প্রযুক্তিবিজ্ঞানী। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কয়েক বত্সর আগে জানাইয়াছে যে, ২০৪৫ সাল সম্ভবত সেই বত্সর, যখন মানুষ অমরত্ব লাভ করিবে। মানুষ ও যন্ত্র একে-অন্যের সঙ্গে একীভূত হইবার পথেই নাকি আগাইয়া চলিতেছে আগামী পৃথিবী, যাহাকে বলা হইতেছে ‘সিঙ্গুলারিটি বিপ্লব’! আর এই ‘সিঙ্গুলারিটি বিপ্লব’ই নাকি একপর্যায়ে মানবসভ্যতাকে সরাইয়া যুগের সূচনা করিবে যন্ত্রসভ্যতার। প্রবলভাবে প্রভাব ফেলিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি। এমনও হইতে পারে যে, আমাদের ‘চেতনা’ কম্পিউটারে স্থানান্তর করা হইতেছে আর কল্পবিজ্ঞানের মতো কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রমানব (রোবট) হয়তো মানুষকে ধ্বংস করিয়া নিজেরাই মানবজাতিতে রূপান্তরিত হইবে। এই কারণে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বারংবার বলিয়াছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ধ্বংসের কারণ হইবে।
কিন্তু বিজ্ঞানের কিছু কিছু বিকাশের ধারা এমনই যে, তাহাকে রোখা যায় না কোনোভাবেই। ধ্বংসের কারণ হউক আর আমাদের আরো সুবিধা বৃদ্ধি করাই হউক—যন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি যোগসূত্র আমাদের না-চাহিলেও হয়তো ঘটিবে একসময়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশও ঘটিবে দ্রুততার সহিত। কিন্তু তাহার পর? আমাদের তাহা জানা নাই। শুধু এইটুকু বলা যায়, ইহার পরও আমাদের অমরত্বের প্রত্যাশা কমিবে না এতটুকু!