আলোকপাত

শীতকালীন শাক আবাদের সহজ পদ্ধতি

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

শীতকালে যত শাক হয় তার মধ্যে সুস্বাদু, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ হলো লাউশাক, লালশাক, মুলাশাক, পালংশাক ইত্যাদি। তা ছাড়া অপ্রচলিত অথচ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাকও এ মৌসুমে উত্পাদিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে বথুয়া শাক, ধনেপাতা শাক, ডাঁটা শাক, দেশি গোলআলু পাতা শাক, চালকুমড়া পাতা শাক, কচুপাতা শাক ইত্যাদিই প্রধান।

 ষড়ঋতুর বাংলাদেশে পৌষ ও মাঘ—এ দুমাস প্রকৃত শীতকাল। কিন্তু ফসলি হিসেবে আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ এমনকি ফাল্গুন মাসকেও শীতকালীন ফসলের মৌসুমের ভেতরে ধরা হয়ে থাকে। এ লম্বা সময় ধরেই শীতের শাক আবাদ হয়ে থাকে, যার প্রাচুর্য লক্ষ করা যায় বাজারে। কাজেই এসব শাকের আবাদ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা দরকার।

আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের দিকে যখন বৃষ্টিপাত একটু কমে আসে তখনই একটু উঁচু ধরনের জমি বেছে নিতে হবে এসব শাক আবাদের জন্য। তা ছাড়া গ্রামে বসতবাড়ির আঙিনায় এবং শহরে বাসাবাড়ির ছাদেও এসব শাকের আবাদ স্বল্প পরিসরে করার সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমে আসি লাউ শাক আবাদের কথায়। এখন কৃষি বিজ্ঞানীরা শাক উপযোগী লাউয়ের একাধিক জাত উদ্ভাবন করেছেন। সেজন্য লাউ শাক চাষের জন্য জমিতে কোনো ধরনের চাষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অপরদিকে মাটি ছাড়াও ঝুলন্ত টবেও লাউশাকের আবাদ করা যায়।

শুধু শাকের জন্য জমিতে ঘনঘন করে লাউয়ের বীজ রোপণ করে দিতে হবে। বীজ গজিয়ে চারা একটু বড়ো হলেই নিচু করে জাংলা দিতে হবে। ভালো হয় বীজ রোপণের আগে গর্ত করে প্রতিটি গর্তে প্রায় কমপক্ষে এক কেজি পরিমাণে শুকনো গোবর, এক মুঠো পরিমাণে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সার প্রয়োগ করে নিলে শাক লতার বৃদ্ধি দ্রুত হয় । সেইসঙ্গে যেহেতু শাকের জন্য পাতাই বেশি কাম্য, তাই তাতে প্রচুর পরিমাণে ডগা ও পাতা বের হয়। অল্প দিনের মধ্যেই ডগাসমেত পাতা ও কাণ্ড কেটে শাক উত্তোলন করা যায়। এক সপ্তাহ পরপরই প্রতিটি গাছের গোড়ায় প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে, প্রয়োজনীয় সেচ দিয়ে শাকের বৃদ্ধি ঠিক রাখতে হবে। তাতে প্রতি সপ্তাহে তো বটেই, সপ্তাহে দু-তিনবার শাক উত্তোলন করা যায়।

এটা তো গেল শুধু শাক লাউয়ের কথা। লাউয়ের উদ্দেশে লাউগাছ আবাদের কালেও প্রচুর লাউশাক একই গাছ থেকে একসঙ্গে উত্তোলন সম্ভব। লাউ একটি উভলিঙ্গিক ফসল হওয়ার কারণে প্রতিটি লাউয়ের কুঁড়িতে যতগুলো মুকুল আসে তার সবগুলো পরাগায়ন না হওয়ায় অনেক ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া ডগা ও পাতা বেশি বেড়ে গেলে কিংবা গাছের বৃদ্ধি বেশি হলেও ফল ঝরে যেতে পারে। কাজেই শেষপর্যন্ত লাউয়ের ফল উত্পাদন বাড়াতে হলেও কাণ্ড, পাতা ও ডগা কেটে ছেঁটে দিতে হয়। সেভাবেও অনেক শাক পাওয়া যায়। এটি একটি লতাজাতীয় শাক।

অন্যদিকে লালশাক, পালংশাক কিংবা মুলাশাক জমিতে আবাদ করতে হয়। সেজন্য লাউশাক আবাদের সঙ্গে অবশ্য অন্য শাক উত্পাদনের হিসাব অতটা মিলবে না। সেগুলো আবাদের জন্য উঁচু জমির প্রয়োজন। সেগুলোর জন্য জমি চাষ দিয়ে নিতে হয়। তবে লাউশাক ছাড়া মুলাশাক, লালশাক কিংবা পালংশাক আবাদ প্রায় একই প্রকৃতির। উঁচু মাটি ভালোভাবে চাষ-মই দিয়ে প্রস্তুত করে সেখানে জৈব ও রাসায়নিক সার পরিমাণ ও প্রয়োজনমতো দিয়ে বীজ ছিটিয়ে বুনে দিয়ে ভালোভাবে যত্ন করলেই তাতে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এগুলো আগাম মৌসুমে ফলাতে পারলে কৃষক আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। কাজেই এগুলো আবাদের মাধ্যমে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আর্থিক লাভবান হওয়ার দিকে এগোতে হবে জাতিকে।   

n লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়