ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পার্লামেন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে। এই রায়কে বিশ্লেষকরা অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক, অসাধারণ ও যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেছেন। শীর্ষ আদালতের এই রায়ের পর বরিস জনসনের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করবেন না বলে ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে। রায়ের পরপরই পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকেছেন স্পিকার। চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত করেন। খবর বিবিসি ও সিএনএনের
রানিকে পরামর্শ দেওয়ার বৈধতা :পার্লামেন্ট স্থগিতের প্রশ্নে রানিকে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তার বৈধতা বিচার করার অধিকার আদালতের রয়েছে কি না, তাই ছিল এই মামলার মূল বিবেচ্য বিষয়। আদালত মনে করছে, এই প্রশ্নে মীমাংসা করার অধিকার তার রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট লেডি হেইল রায়ে উল্লেখ করেছেন, কয়েক শতাব্দী ধরে সরকারের কাজের আইনগত বৈধতা বিচার করার এখতিয়ার আদালতের আছে। ১৬১১ সালে তত্কালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজাও আইনের বাইরে যেতে পারেন না বলে আদালত মনে করে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা
সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, আগামী ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে পার্লামেন্ট স্থগিত রাখা হয়েছে যার প্রভাব পড়েছে সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর। এই বিষয়টিও আদালত বিবেচনা করেছে। এসব পরিবর্তন নিয়ে পার্লামেন্ট, বিশেষভাবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে হাউস অব কমন্সের কথা বলা অধিকার আছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারার ওপর তাই সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল চরম।
স্থগিতাদেশের পক্ষে যুক্তিহীনতা
আদালত রায়ে বলেছে, পার্লামেন্টের অধিবেশনের স্থগিতাদেশের পেছনে যুক্তিগুলো সরকারপক্ষ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। রানির ভাষণের প্রস্তুতির জন্য যেখানে চার থেকে ছয় দিনের প্রয়োজন হয়, সেখানে পাঁচ সপ্তাহ আগে কেন পার্লামেন্ট স্থগিত করার প্রয়োজন হলো তার কোন ব্যাখ্যা সরকারের কাছে ছিল না। পাশাপাশি, পার্লামেন্ট স্থগিত করা এবং অধিবেশনের ছুটির বিষয়টি নিয়েও কোন ব্যাখ্যা নেই বলে লেডি হেইল রায়ে উল্লেখ করেন। সে কারণেই আদালত মনে করছে, রানিকে পার্লামেন্ট স্থগিত করার সরকারি পরামর্শটি ছিল বেআইনি যার ফলে পার্লামেন্ট তার ওপর ন্যস্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ পায়নি।
বাইরে থেকে চাপানো সিদ্ধান্ত
সরকার যুক্তি দেখাচ্ছে যে পার্লামেন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টের নিজস্ব ব্যাপার এবং ১৬৮৮ সালের নাগরিক অধিকারের সনদ অনুযায়ী এ নিয়ে আদালত কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে না। কিন্তু লেডি হেইল বলেন, অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি বাইরে থেকে পার্লামেন্টের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টের কার্যক্রমের অংশ ছিল না। এমপিরা এই প্রশ্নে কোন ধরনের আলোচনা বা ভোটদানের সুযোগ পাননি বলে তিনি রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, পরবর্তী পদক্ষেপের সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্ট এবং বিশেষভাবে স্পিকারকেই নিতে হবে। অন্য বাধা না থাকলে অতি দ্রুত পার্লামেন্টের দু’টি কক্ষের অধিবেশন চালু করা যায়। লেডি হেইল তার রায়ের পক্ষে যুক্তি দেখান এই বলে যেহেতু স্থগিতাদেশটি ছিল অবৈধ, তাই পার্লামেন্টের অধিবেশন স্থগিত হয়নি বলে বিবেচিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক প্যানেলের ১১ জন সদস্যই এই প্রশ্নে একমত বলে তিনি রায়ে উল্লেখ করেন। সুপ্রিম কোর্টে দু’টি আপিল মামলা নিয়ে এই শুনানি চলে তিন দিন ধরে। এর একটি করেছিলেন ব্যবসায়ী জিনা মিলার। দ্বিতীয় আপিলটি করে সরকার। সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় সরকারের বিরুদ্ধে এবং অপরটিতে ব্যবসায়ী জিনা মিলারের পক্ষে রায় দেয়।
দাবি উঠলেও পদত্যাগ করবেন না বরিস
হাউজ অব কমন্সের স্পিকার জন বারকো আদালতের রায়েকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, আর দেরি না করে অবিলম্বে পার্লামেন্টকে বসতে হবে। তিনি এরই মধ্যে বুধবার (আজ) পার্লামেন্টের অধিবেশন ডেকেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলেছেন তার বিরোধী এবং সমালোচকরা। তাকে পদত্যাগ করার দাবি তুলেছেন অনেকে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী জো সুইনসন বলেছেন, বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত নন। স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির পার্লামেন্টারি দলের নেতা ইয়ান ব্ল্যাকফোর্ড এই রায়কে ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, জনসনের উচিত তার নিজের অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা। তিনি হতে পারেন ব্রিটেনে সবচেয়ে কম সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী। কনজারভেটিভ পার্টিরই এক নেতা এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ডোমিনিক গ্রিভ বলেছেন, তিনি এই রায়ে বিস্মিত হননি, কারণ প্রধানমন্ত্রী গুরুতর অসদাচারণ করেছেন। তবে ক্ষমতাসীন দলের আরেক এমপি এন্ড্রু ব্রিজেন বলেছন, এটি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে খারাপ ফল বয়ে আনবে। এই পার্লামেন্ট এমন এক অবস্থান নিয়েছে, যেটা গোটা দেশের মানুষের সেন্টিমেন্ট থেকে আলাদা এবং পার্লামেন্ট আসলে গণতন্ত্রকে জিম্মি করেছে। বরিস সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরিস জনসন পদত্যাগ করবেন না বলে ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দিয়ে তিনি আজ দেশে ফিরবেন।
বিবিসির আইন বিষয়ক সংবাদদাতা ক্লাইভ কোলম্যান বলেছেন, এটি হচ্ছে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহারণ, বিচারিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যেখানে আদালত সরকারকে থামিয়ে দিয়েছে। কারণ সরকার যা করছিল তা ছিল বেআইনি। কেউ যতো ক্ষমতাবানই হোন, হতে পারেন তিনি প্রধানমন্ত্রী, আইনের উর্ধ্বে তিনি নন।