এ কে এম শহীদুল হক
ঢাকা মহানগরীতে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ হতে স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে। ঢাকার বাহিরে দু-একটি জেলায়ও অভিযান হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে র্যাব। ঢাকা মহানগর পুলিশও ক্লাবগুলোয় অভিযান চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে মতিঝিলের ইয়ংমেনস ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র, ওয়ান্ডারার্স ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাব, কলাবাগান ক্রীড়া চক্র, ধানমন্ডি ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাবে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযান চলমান আছে। ঐ সব ক্লাব থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাসিনো বোর্ডসহ বিপুল পরিমাণ জুয়া খেলার সামগ্রী, নগদ টাকা, অস্ত্র এবং মদ ও বিয়ার জব্ধ করে।
ইয়ংমেনস ক্লাবের সভাপতি ও যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া এবং কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম (ফিরোজ)কে গ্রেফতার করা হয়। যুবলীগ নেতা পরিচয়দানকারী জি কে শামীমকে নিকেতনের তার অফিস থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর রিসিপ্টসহ আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহীর এক সভায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার পরেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করেন এবং ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত যুবলীগ নেতা ও যুবলীগ নামধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। ক্লাবগুলো থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয় এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে তাত্ক্ষণিকভাবে সাজা প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে আইনের শাসন ও গুড গভর্ন্যান্স তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক বাক্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি আট মাস পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সূত্র থেকে সামগ্রিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কতিপয় নেতা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে এবং তা সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। এ তথ্য জানার পর প্রধানমন্ত্রী এদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন।
একজন রাষ্ট্রনায়কের গভীর দেশপ্রেম, নিজের শতভাগ স্বচ্ছতা, নৈতিক সাহস ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকলে এভাবে নিজের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি অভিযান চালাতে পারেন না। শেখ হাসিনার মধ্যে সে গুণাবলি আছে বিধায়ই এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন, যা দেশবাসী স্বাগত জানাচ্ছে।
স্পোর্টিং ক্লাবের কাজ ক্রীড়াবিদ তৈরি করা। ক্রীড়ার অনুশীলন ও ক্রীড়ার মানোন্নয়নের জন্য কাজ করা। যুবকদের বিনোদনের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা। একইভাবে সামাজিক ক্লাবগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সমাজ উন্নয়ন, সামাজিক দায়িত্ব পালন ও সমাজের দুস্থদের পাশে থাকা এবং সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলোর লক্ষ্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুবকদের জড়িত করে তাদেরকে সুস্থ পরিবেশে ধরে রেখে নির্মল বিনোদন ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করা। কিন্তু সাধারণ জনগণের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে, ক্লাব মানেই জুয়া খেলার জায়গা, মদ খাওয়ার জায়গা। জুয়া ও মদ ক্লাবের অনুষঙ্গ হিসেবেই অনেক মনে করে। কিন্তু ক্লাবগুলোকে ক্যাসিনো বানানো এবং ক্যাসিনোর মাধ্যমে জুয়ার আসর বসানো এটা অতীতে কেউ দেখেনি। এটা ধারণারও বাইরে ছিল।
ক্লাবকেন্দ্রিক ক্যাসিনো ব্যবসাকে ঘিরে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্রে শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতা রয়েছে। শুধু প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, নেপথ্যে থেকে যারা মদদ দিয়েছে এবং যারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে, সে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হোক বা ক্লাব কর্মকর্তা বা আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যই হোক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাই হোক, সবাইকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তারা তাদের অবস্থান সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
আমরা অতীতে দেখেছি, সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। অভিযান, গ্রেফতার, মামলা ইত্যাদির মাধ্যমে চমক ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তা ঝিমিয়ে যায় এবং তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। ফলে ঐ সব অভিযানের টেকসই ও ইতিবাচক প্রভাব সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসনে পড়েনি। এবারের শুদ্ধি অভিযান একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অতীতে কোনো রাজনৈতিক দল নিজ দলের মধ্যে এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান করেছে বলে আমার জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী সবকিছু বুঝে-শুনে, সুচিন্তিতভাবে এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস। এ অভিযান থেকে অন্যরা সতর্ক হবে এটাই কাম্য। নিজেরা সংশোধিত না হলে তাদের পরিণতি একই হবে।
বাংলাদেশে জুয়াখেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো প্রকার জুয়াখেলার অনুমতি কোনো কর্তৃপক্ষেরই দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ জুয়াখেলার বিরুদ্ধে দেশে তেমন কোনো শক্ত আইন নেই। একমাত্র আইন The Public Gambling Act, 1867, যা মেট্রোপলিটন সিটি, অর্থাত্ মহানগরের বাইরে প্রযোজ্য। মহানগর এলাকায় জুয়াখেলার বিরুদ্ধে তেমন কোনো আইন নেই, যা পুলিশ প্রয়োগ করতে পারবে। The Public Gambling Act, 1867তে জুয়াখেলার অপরাধে শাস্তির বিধান খুবই লঘু। এক-দুই মাস জেল অথবা ১০০-২০০ টাকা জরিমানা। এই আইন প্রয়োগ করে জুয়াখেলা বন্ধ বা দমনের সুযোগ খুবই কম। অতীতের ঔপনিবেশিক শাসক বা এদেশীয় শাসক বা আইনপ্রণেতা জুয়াখেলার অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান চাননি। তারা জুয়াখেলাকে বড়ো ধরনের অপরাধ মনে করেননি বিধায় কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেননি। অথচ সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে জুয়াখেলা একটি বড়ো অপরাধ। সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব প্রকট। তাই এই আইনের সংশোধন দরকার এবং মহানগরের জন্য নতুন আইন করা বা The Public Gambling Act, 1867 মহানগরের জন্য প্রযোজ্য করা প্রয়োজন।
যেহেতু জুয়াখেলা বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেহেতু এর সামগ্রীও আমদানি অযোগ্য আইটেম হওয়া স্বাভাবিক। তাহলে ক্যাসিনো কীভাবে দেশের মধ্যে প্রবেশ করল? এগুলো তো বিমানবন্দর বা স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ঢুকেছে। ঐ সব বন্দরে কাস্টম কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এতগুলো ক্যাসিনো দেশের মধ্যে ঢুকবে তা অস্বাভাবিক। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অপরিহার্য। কারো কোনো সম্পৃক্ততা, উদাসীনতা বা অবহেলা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন।
স্পোর্টিং ক্লাবগুলোর কর্মকাণ্ড পরিচালনার এবং খেলোয়াড়দের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। এজন্য দেশের সব ক্লাবে সপ্তাহে এক বা দুই দিন হাউজি খেলার বিষয়টিতে প্রশাসনের মৌন সমর্থন থাকে। ভেতরে তাস বা তাসের মাধ্যমে সীমিত আকারে জুয়াখেলা নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ থাকে না। এগুলো ক্লাবের আয়ের উত্স হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ক্যাসিনোর মাধ্যমে বড়ো ধরনের জুয়াখেলা এবং এর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা, যা কতিপয় ব্যক্তির পকেটে যায়, তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বেআইনি ও সমাজবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সবার সোচ্চার হওয়া অত্যাবশ্যক। একইসঙ্গে ক্লাবগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ক্লাব চালাতে হলে অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, ক্লাবের আয়ের উত্স কী হবে, তা-ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। ঢালাওভাবে সব ক্লাবে হানা দেওয়া ঠিক হবে না। যেখানে ক্যাসিনো বা বড়ো জুয়াখেলার অভিযোগ বা গোপন তথ্য পাওয়া যাবে, শুধু সেখানেই অভিযান করা যায়। ক্লাবপাড়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি না করাই ভালো।
দেখা যায়, সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বিশেষ করে শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নানা অনিয়ম ও অপকর্মে জড়িয়ে যান। তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বাস-লঞ্চ-টেম্পো টার্মিনাল, হাটবাজার ও খেয়াঘাট দখল করে আয়রোজগার করেন। সংগঠনের নেতারাও সহযোগী সংগঠনের এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের তেমন কোনো উদ্যোগ নেন না। তারা মনে করেন, দল যখন ক্ষমতায়, তখন দলের লোকজন কিছু আয়রোজগার করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোক। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে সীমা অতিক্রম করে, সে ব্যাপারে কারো মাথাব্যথা থাকে না। তাই তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়।
মিডিয়া রিপোর্টে আরো জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে যুবলীগের ছয় শীর্ষ নেতা ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের মধ্যে পাঁচ জনই অন্য দল থেকে যুবলীগে অনুপ্রবেশকারী। কেউ বিএনপির যুবদল থেকে, কেউ আবার জামায়াত-শিবির থেকে, কেউ জাতীয় পার্টি থেকে, কেউ ফ্রিডম পার্টি থেকে। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগে জামাত-শিবির ও ফ্রিডম পার্টির লোকের আশ্রয়স্থল হবে, এটা ভাবাই যায় না। কোনো যুক্তিতেই এটা মানা যায় না। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক দলের কার্যকরী কমিটিতে ঢুকতে হলে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। যুবলীগে ঢুকতে নাকি ৫০ লাখ টাকাও কেউ কেউ ঘুষ দিয়েছেন। এটা পার্টির কর্মীরাই বলে থাকেন। এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিরা যুবলীগে ঢুকতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন, তা অবিশ্বাস করার কিছু নেই। তারা তো নানা অপকর্মের মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছানোর জন্যই শাসক দল বা শাসক দলের সহযোগী সংগঠনে ঢুকে নিরাপদে অপকর্ম চালান। তাদের কাছে দলের আদর্শ বা নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। শাসক দলকে নিজের আশ্রয় ও অবৈধ প্রভাবের প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যবহার করে অর্থ রোজগার ও প্রতিপত্তি লাভ করে থাকেন।
যুবলীগে কীভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত হলো, তার জবাব সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বকেই দিতে হবে। তাদের এত বেপরোয়া হওয়ার বিষয়টির দায়িত্বও শীর্ষ নেতৃত্ব এড়াতে পারেন না।
প্রধানমন্ত্রী যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন, তা সামরিক সরকারের স্ট্যান্ডবাজির মতো হবে না এবং এ উদ্যোগের কার্যকারিতা অব্যাহত থাকবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। দেশবাসী বিশ্বাস করে, প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবেই দেশে আইনের শাসন, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে চান। তার দলের নেতাকর্মী, সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা—সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীর এই শুভ উদ্যোগকে স্বাগত জানালে, সমর্থন ও সহযোগিতা করলে জনগণের কল্যাণ হবে, দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। তাই এ ব্যাপারে প্রত্যেক নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
n লেখক :সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ