বাহালুল মজনুন চুন্নু
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য কাজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা। এবং এর পরের ঘৃণ্য কাজ হচ্ছে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ তথা দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করার মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজকে রহিত করা। আর এই দুটি ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। মানুষ কতটা খারাপ হতে পারে, কতটা বিবেকহীন ও বিশ্বাসঘাতক হতে পারে তার জলন্ত প্রমাণ এদের এই ঘৃণ্য কাজ। এরা দুজনেই যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল তা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বই-পুস্তকে প্রমাণসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার এই দুই জনের একজন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন এবং অন্যজন তা বাস্তবায়ন করেন। এরাই আমাদের দেশকে শাসন করেছে, আবার আমাদের অনেকে এদেরকে সমর্থনও দিয়েছে, যা বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য ভারি লজ্জার এক বিষয়।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রকাশিত হয়েছিল ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ নামে যেখানে স্বাক্ষর ছিল খন্দকার মোশতাকের। এবং স্বাক্ষর ছিল তত্কালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের। অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থি যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাত্ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। এ যে কত বড়ো আইনের ব্যত্যয় তা কি আমরা কখনো ভেবেছি। রাতের অন্ধকারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো অথচ হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না, এ যে কত অন্যায়, কত বড়ো অবিচার তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। অথচ এমন ঘটনাই এদেশে ঘটেছে। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ বলেই এমনটা ঘটেছে এবং দীর্ঘ একুশ বছর আমরা তা নীরবে মেনেও নিয়েছি। এই ঘৃণ্য অধ্যাদেশটি জারি করার দায় খন্দকার মোশতাকের হলেও বৈধতা দিয়ে বড়ো অপরাধ করেছিল জিয়াউর রহমান। বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে বুঝতে সহজ হবে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় অর্থাত্ ২৪ আগস্ট ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। আর মোশতাক সরকার ছিল সম্পূর্ণভাবে সেনাসমর্থিত সরকার। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান সেহেতু এর দায় তিনি এড়াতে পারেন না! আবার জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ঐ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। অথচ এই বৈধতা না দিলে সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমান সেটা তো করলেনই না, বরং প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দিলেন যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন হবে না। বাঙালি জাতি নিশ্চুপে দেখল তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শাস্তির পরিবর্তে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করছেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বেশ দম্ভভরেই বলে বেড়াত, একটুও বিবেকবোধ তাদের কখনো নাড়া দেয়নি।
যদি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল না করত, তাহলে এদেশে কখনোই ন্যায়বিচারের পথ খুলত না। ভাবতেই অবাক লাগছে, পঁচাত্তরের পরবর্তী একুশ বছর যে সরকারগুলো ছিল তারা এই অধ্যাদেশ বাতিলের কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে দেশে সৃষ্টি করেছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আর আজকে তারাই ন্যায়বিচার ন্যায়বিচার বলে চিত্কার করছে। একবারও তারা পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে না। বরং তাদের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এই কারণে যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার অতল গহিনে হারিয়ে যাওয়া ন্যায়বিচারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। সর্বশেষ একটা কথা বলব। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সম্পর্কে আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানে না। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের জন্য তাদের এই অধ্যাদেশটি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্ম যদি এই অধ্যাদেশটি পঠন ও অনুধাবন করে, তাহলে তারা এদেশের ইতিহাসের প্রকৃত সত্য, কলঙ্কজনক সত্য উপলব্ধি করতে পারবে।
n লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ