এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ
দৈনন্দিন জীবনে আমরা ব্যাপকহারে পলিথিনের ব্যবহার করছি। এ কথা সত্য যে, স্বল্প খরচ ও ব্যবহারের সুবিধা পলিথিনের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে; সেই সঙ্গে কিছুটা হলেও আমাদের জীবনকে করেছে সহজ। কিন্তু এই পলিথিনের ক্ষতির দিকটি বিবেচনা না করেই আমরা প্রতিনিয়ত নানান কাজে এটা ব্যবহার করছি এবং ব্যবহারের পর নিয়ম না মেনেই ফেলছি যত্রতত্র। যার দরুন ভয়ংকর সব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ। ক্রমাগত বেড়ে চলা নানামুখী দূষণের ফলে বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ দূষণের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নাম লিখিয়েছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে বিপদে থাকা শীর্ষ দশ দেশের তালিকায়ও। পরিবেশ দূষণে মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে পলিথিনের ভূমিকা এখন এদেশে ভয়াবহ পর্যায়ে অবস্থান করছে। নীরব ঘাতক এই পলিথিন শুধু মাটি নয়, আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্র্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন করে তুলেছে জীববৈচিত্র্যকে। এরই মধ্যে অকেজো করে দিয়েছে বড়ো বড়ো শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেও। নদী-নালা, খাল-বিল, নর্দমা, পুকুর, খেলার মাঠ, বসতবাড়ির আনাচ-কানাচ থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গা আজ আমাদের ব্যবহূত পলিথিনের দখলে। এসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে পলিথিন এখন সমুদ্রকেও দূষিত করছে। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী পলিথিনকে খাবার মনে করে খেতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলেও ঢুকে পড়েছে পলিথিন তথা প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রতি সপ্তাহে একজন মানুষকে খেতে হচ্ছে পাঁচ গ্রাম প্লাস্টিক! পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, আমরা দেশের সিংহভাগ নাগরিক পলিথিন ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে জানি। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই প্রথম পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। তাই বলে কিন্তু এদেশে পলিথিনের উত্পাদন, বাজারজাতকরণ এবং ব্যবহারে মোটেও ভাটা পড়েনি; বরং আগের তুলনায় বেড়েছে কয়েকগুণ। শহরের অভিজাত বিপণি থেকে আরম্ভ করে অজপাড়াগাঁয়ের কাঁচাবাজার পর্যন্ত ক্রয়কৃত অধিকাংশ পণ্য দেওয়া হচ্ছে পলিব্যাগে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সচেতনতার বুলি আওড়াতে আওড়াতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ২০০২ সালে সংশোধিত পরিবেশ আইনে রপ্তানিমুখী শিল্প ছাড়া সকল সকল প্রকার পলিথিন ব্যাগ উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। এই আইন অমান্য করলে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়। পাশাপাশি পলিথিন ব্যাগ বাজারজাত করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আইনও করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালে পলিথিনের পরিবর্তে প্রতিটি মোড়কে পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন পাশ করা হয়। মূল কথা হচ্ছে আইন আছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। পাশকৃত আইন কাগজের পাতাতেই রয়ে গেছে। বাস্তবায়নের অভাবে সে আইনের সোনার বাংলার সোনামুখ আর দেখা হয়ে ওঠেনি। কে নেবে এর দায়ভার? কাকে দোষারোপ করব আমরা? প্রশ্ন দুটির উত্তর বোধহয় এদেশে আদৌ পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদেরকেই (সাধারণ জনগণ) এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের স্বার্থে ফিরিয়ে আনতে হবে কিছু পুরোনো অভ্যাস। বিগত দশকের গ্রাম-বাংলায় প্রচলিত কিছু ঐতিহ্যের পুনঃপ্রবর্তন এখন সময়ের দাবি, যে সময়টাতে বাজার করার জন্য প্রতিটি মানুষ আলাদা একটি ব্যাগ নিয়ে তবেই যেতো বাজার করতে। ডাল, চিনি, লবণ, আটা, মসলা প্রভৃতি দ্রব্য কাগজের ঠোঙায় করে বিক্রি করা হতো। মাছ-মাংস বিক্রি হতো কলা বা কচুর পাতায় করে। নানা আচার-অনুষ্ঠানে খাবারের প্লেট হিসেবে ব্যবহার করা হতো কলাপাতা এবং পদ্মপাতা। সেই সময়টাতে কলাপাতা ছিলো মজলিশ খাবারের প্রধান আকর্ষণ! সভ্যতার চরম উত্কর্ষতার এই যুগে কথাগুলো শুনে আপনাদের খুব হাসি পাচ্ছে নিশ্চয়? কিন্তু সত্যি হলো, পলিথিনের ভয়াবহ দূষণের এই যুগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুটি দেশ পলিথিনের বিকল্প হিসেবে আবার কলাপাতার ব্যবহার শুরু করেছে। থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের অভিজাত সব সুপারশপগুলোতে প্লাস্টিকের ব্যাগ এবং পলিথিনের পরিবর্তে কলাপাতায় মুড়িয়ে সবজি বিক্রি করা হচ্ছে। তারা নানান খাবারের প্যাকেট তৈরিতে ব্যবহার শুরু করেছে কলাপাতার। কলাপাতায় করে তারা মাংস বিক্রির সিদ্ধান্তও নিয়েছে। কলাপাতার এমন বিকল্প ব্যবহার বর্তমানে দূষণের এই নগ্ন রাজ্যে নিঃসন্দেহে পরিবেশ রক্ষার এক সৃজনশীল উদ্যোগ বলে বিবেচিত হতে পারে। আমাদের একটা অভ্যাস আর একটু সচেতনতাই পারে পলিথিনের ব্যবহারকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করতে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য, পলিথিনের বিরূপ প্রভাব থেকে পরিবেশকে রক্ষার জন্য আমাদেরও একটু ভেবে দেখা দরকার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আল ফিকহ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া