গার্মেন্টস কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারি উদ্যোগের আওতায় থাকা ৩৫৬টি কারখানা গত চার বছরেও সংস্কারকাজ শুরু করেনি। কারখানাগুলোর সংস্কার শুরু করা নিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও কর্যকর ফল মেলেনি। বর্তমানে এর মধ্যে অনেক কারখানারই লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোর ব্যবসা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয় কারখানাগুলোর উত্পাদন কার্যক্রম বন্ধ না করে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজছে। এর অংশ হিসেবে কারখানা প্রতিনিধিদের সমস্যা শুনতে চাইছে মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে সম্প্রতি গাজীপুরে ৩৫ কারখানার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই)। আগামী ৯ ও ১০ অক্টোবর আরো ৩২১টি কারখানার সঙ্গে বৈঠক হবে। এতে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতৃবৃন্দও থাকবেন।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আলোচ্য কারখানাগুলোর মধ্যে ৩৫টি কারখানার পক্ষে কার্যত উত্পাদন কার্যক্রমে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। কিছু প্রক্রিয়া শেষে এ কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। বাদবাকি ৩২১টি কারখানা সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিকল্পনা (ড্রয়িং ও ডিজাইন) ডিআইএফইতে জমা দিলেও তা সংস্কারের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় অনুমোদন হয়নি। নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্কার পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হলেও কারখানাগুলো তা এতদিনেও করতে পারেনি। ফলে দৃশ্যত কারখানাগুলোর কোনো সংস্কার কাজই শুরু হয়নি।
এর মধ্যে গত দেড় বছর আগে দুই শতাধিক কারখানার ইউডি সেবা (রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানির ঘোষণার অনুমোদন) স্থগিত রাখতে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে চিঠি পাঠিয়েছিল ডিআইএফই। যদিও অল্প কিছু বাদে বেশিরভাগ কারখানারই ইউডি সেবা বন্ধ হয়নি। এর বাইরে আরো বেশকিছু কারখানার এই সেবা বন্ধ করতে চিঠি দেওয়া উদ্যোগ নিয়েছিল ডিআইএফই। তবে আপাতত সে পথে হাঁটছে না ডিআইএফই। ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় ইত্তেফাককে বলেন, ইউডি বাতিলের আগে আমরা কারখানা মালিকদের কাছ থেকে তাদের কথা সরাসরি শুনতে চাই। কার গাফিলতিতে সংস্কার এগোচ্ছে না, সেটিও জানতে চাই। তবে আমরা জেনেছি, মূল সমস্যা অর্থায়ন। এছাড়া ভাড়া বাড়িতে থাকা কারখানা ভবনের সংস্কারের ক্ষেত্রে ভবনের মালিকের অনীহাও অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা সমাধানে এবার আমরা কার্যকর উদ্যোগ নিতে চাই।
বিজিএমইএ ও কারখানা মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সংস্কারে পিছিয়ে থাকা কারখানাগুলোর বেশিরভাগই ছোটো ও মাঝারি আকারের। এসব কারখানা আর্থিকভাবে ততটা সবল নয়। বেশকিছু কারখানা আবার ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সংস্কারে কারখানা প্রতি দেড় থেকে দুই কোটি টাকা প্রয়োজন। এ বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে কারখানা সংস্কার করা এসব মালিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার ভাড়া কারখানার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষও এত বিনিয়োগে আগ্রহী নন। ফলে এসব কারখানা পিছিয়ে রয়েছে।
শিবনাথ রায় ইত্তেফাককে বলেন, যেসব ভবনে সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সেসব ভবনের সংস্কারের জন্য আমরা মালিকপক্ষকে চিঠি পাঠাব। এ ছাড়া অর্থায়ন সংকট সমাধানে জাপান উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছে। আশা করছি স্বল্প সূদে ঋণের ব্যবস্থা করা যাবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় পর ঐ বছরই ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে আলাদা দুটি জোট গঠিত হয়। এসব বায়ারের কাছে রপ্তানিকারক প্রায় দুই হাজার গার্মেন্টস কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে ত্রুটি সংস্কার তদারকির দায়িত্ব নেয়।
ওই জোটভুক্ত কারখানাগুলোর সংস্কারে অগ্রগতি গড়ে ৯০ শতাংশের ওপরে। তবে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তদারকির বাইরে থাকা দেড় হাজার কারখানা সংস্কারের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের শুরুতে উদ্যোগ নেয় সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়। চার বছর সময় পেরিয়ে গেলেও এ কারখানাগুলো ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক ত্রুটির সংস্কার হয়েছে মাত্র এক তৃতীয়াংশ। এই সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া, স্থানান্তর কিংবা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সে যুক্ত হওয়া কারখানা বাদ দিয়ে এখন ৬৯৭টি কারখানার সংস্কার দেখভাল করছে ডিআইএফই।