১০ লাখ টন ধান মজুত করা যাবে, ন্যায্যমূল্য পাবেন প্রান্তিক কৃষক
মুন্না রায়হান
প্রতি বছর উত্পাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া নিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের যে হতাশা, তা ঘোচাতেই এবার ২০০ প্যাডি সাইলো (ধান সংরক্ষণাগার) নির্মাণ করছে সরকার। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে এই সাইলোতে মজুত করা হবে। প্রতিটি সাইলোর ধারণক্ষমতা ৫ হাজার টন। এ হিসাবে মোট ১০ লাখ টন ধান সংরক্ষণ করা যাবে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে প্যাডি সাইলো নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। সারাদেশে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের পাশাপাশি যেসব এলাকায় ধান উত্পাদন বেশি হয়, সাইলো নির্মাণে সেসব এলাকাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ সাইলোতে দুই বছর পর্যন্ত ধান সংরক্ষণ করা যাবে। এতে ধানের মানের কোনো হেরফের হবে না।
খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, ধানের আর্দ্রতার সমস্যা, পর্যাপ্ত গুদামের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা যায় না। অথচ কৃষকদের উত্পাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য দিতেই সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতি বছর ধান-চাল সংগ্রহ করে। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ধান কিনতে না পারায় প্রান্তিক কৃষকেরা এর কোনো সুফল পান না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর ধরেই কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এবার বোরো মৌসুমেও প্রতি মণ ধানে একজন প্রান্তিক কৃষককে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়েছে। দেশের অনেক জায়গায় কৃষক জমির ধান না কেটে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন—এমন ঘটনাও ঘটেছে। হতাশ অনেক কৃষক ধান ছেড়ে অন্য ফসল উত্পাদনে ঝুঁকছেন।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ফসল ফলান। তারা ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা বিক্রি করে দেন। এ সময় যদি ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া যায়, তাহলে তারা একদম পথে বসে যান। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আমন ও বোরো মৌসুমে যে পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করে, তা মোট উত্পাদনের তুলনায় খুবই কম। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর সাড়ে ৩ কোটি টনের বেশি চাল উত্পাদন হয়। সেখানে ১৫ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করলে বাজারে কোনো প্রভাব পড়বে না। এ অবস্থায় প্রান্তিক কৃষককে ধানের ন্যায্যমূল্য দিতে সরকারিভাবে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের গুদামে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টন খাদ্যশস্যের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এ অবস্থায় গুদামের পরিমাণ না বাড়ালে সংগ্রহের পরিমাণও বাড়ানো যাবে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী ইত্তেফাককে বলেন, সরকারের ধান-চাল কেনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্ষুদ্র কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকার যে পরিমাণ ধান-চাল কেনে এবং যে প্রক্রিয়ায় কেনে, তাতে এটা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, খাদ্যশস্য কেনার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোছাম্মত্ নাজমানারা খানুম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, প্রান্তিক কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেই ২০০ পেডি সাইলো নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্যাডি সাইলোগুলো নির্মাণ হলে তখন অনেক বেশি পরিমাণ ধান কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করা যাবে। এতে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই সাইলো নির্মাণের ফলে আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ২৫-২৬ শতাংশ আর্দ্রতাযুক্ত ধানও কিনতে পারব। এই ধান সংরক্ষণে কোনো সমস্যা হবে না।’ খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরো বলেন, ‘এখন এই প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই প্রকল্প পাশ হবে বলে আশা করছি।’