চট্টগ্রামে পারিবারিক বিরোধে বাড়ছে মামলা ও বিয়ে বিচ্ছেদ

পারিবারিক বিরোধ নিয়ে চট্টগ্রামে অভিযোগ ও মামলা বাড়ছে। এর ফলে বাড়ছে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা। সরকারি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা, ব্লাস্ট ও আদালতগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য নির্যাতিত নারী ধরনা দিচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতায় পারিবারিক বিরোধ বাড়ছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিলের কারণে বিচ্ছেদ, যৌতুক, স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামী ভরণপোষণ দিচ্ছে না, শাশুড়ি, ননদ, দেবর নির্যাতন করার অভিযোগই বেশি।

চট্টগ্রামে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে প্রতিমাসে ২০/২৫টি করে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আবার অনেকেই সরাসরি আদালতে মামলা করছে। এর মধ্যে আপসের মাধ্যমে মীমাংসা হচ্ছে কম। মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী আলাদা বসবাস করছে। এতে এক পর্যায়ে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটছে। চট্টগ্রামে আদালত ভবনের সাতটি কোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ৮ হাজার ৩৬০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই যৌতুক ও বিয়ে বিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলা। মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৭টি।

জানা যায়, চট্টগ্রামের মধ্যে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ড উপজেলা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে নারী নির্যাতন বিরোধ নিয়ে অভিযোগ ও মামলা বেশি হচ্ছে। চট্টগ্রামে প্রতিটি উপজেলায় পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে কমিটি রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ নিয়ে এই কমিটির কাছে অভিযোগ করা যায়। তাদের কাছে অভিযোগ আসার পর নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষকে ডাকা হয়। এতে মীমাংসা না হলে পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলায় গড়ায়। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শহরে মহিলা সহায়তা কর্মসূচি নামে সরকারি সংস্থা রয়েছে। এখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগ মীমাংসা করা হয়। এই কার্যালয়ে নির্যাতিত নারীদের ছয় মাস রেখে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। চট্টগ্রামে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে গত আট মাসে ১৫০টি মামলা তদন্তের জন্য জমা পড়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জিন্নাত সুলতানা ইত্তেফাককে বলেন, প্রতি মাসেই অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ছে। আমরা নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষকে ডেকে মীমাংসার চেষ্টা করি। তবে গরিব লোকদের অভিযোগ অনেকাংশে  নিষ্পত্তি হলেও যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা সরাসরি কোর্টে মামলা করছে। আপসে যাদের বিচ্ছেদ হচ্ছে তাদের দেনমোহরের টাকা আদায় করে দেওয়া হচ্ছে।’ চন্দনাইশ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাতকানিয়া উপজেলারও অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। এ ব্যাপারে মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা গীতা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিমাসেই সাত/আটটি করে অভিযোগ জমা পড়ছে। সাতকানিয়ায় অভিযোগের পরিমাণ বেশি। অভিযোগ নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও আবার অন্যকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত অভিযোগে আমরা উভয় পক্ষের মধ্যে নিষ্পত্তিতে বেশি জোর দিয়ে থাকি। ’

চট্টগ্রামের আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০১৯ সালে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির চার জনকে আসামি করে মামলা করেন বোয়ালখালীর পপি দাশ। তিনি বলেন, আমার স্বামী গাড়ি চালানো ছেড়ে দিয়ে আমার বাবার বাড়ি থেকে ২ লাখ টাকা আনতে বলে। টাকা আনতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে নির্যাতন করতে থাকে। পরে আমি আদালতে মামলা করি। আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে রয়েছি।’ চট্টগ্রাম আদালত ভবনে আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিচার পরিচালনার জন্য তিনটি আদালত ছিল। বর্তমানে তা বাড়িয়ে সাতটি করা হয়েছে। আদালতগুলোতে বর্তমানে ৮ হাজার ৩৬০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। 

জানতে চাইলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-১ এর সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট জেসমিন আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে দায়ের করা মামলা বেশি। প্রতিদিনই নতুন করে মামলা হচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তির হার কম।’

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) নির্যাতনের শিকার নারীদের আইনি সহায়তা প্রদান করছে। ব্লাস্ট সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ৬৭টি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক আইনে দেনমোহর আদায় নিয়ে মামলা বিচারাধীন রয়েছে ১৯৬টি। দেনমোহর নিয়ে সালিশি বৈঠকের অপেক্ষায় রয়েছে ১৭৭টি। আর শুধু  যৌতুকের মামলা রয়েছে ৯৪টি।

জানতে চাইলে ব্লাস্ট চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ইত্তেফাকে বলেন, আমাদের কাছে যৌতুক সংক্রান্ত বেশি অভিযোগ নিয়ে আসছে। অভিযোগের মধ্যে মীমাংসা না হওয়ায় পরবর্তীতে মামলা হচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ খুবই কম। আসামি পলাতক ও আদালতে সাক্ষী হাজির করা যাচ্ছে না। বাদী গরিব হলে পাঁচ/ছয় মাস চালানোর পর হতাশ হয়ে পড়ে। সামাজিক অস্থিরতার কারণে পারিবারিক সমস্যা বাড়ছে।’