ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি একটি ক্ষুদ্র জরিপ করিয়া বড়ো আকারের বিবৃতি দিয়া জানাইয়াছে, দেশে ৮৯ শতাংশ মানুষ জীবনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির শিকার। ইহার মধ্যে ৭৫ শতাংশ মানুষ কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই ঘুষ দিয়া থাকেন। আর প্রতিবাদ করা ২৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ ইতিবাচক ফল পাইয়া থাকেন। বিবৃতির মাধ্যমে জানানো এইরকম ফলাফল শুনিয়া সাধারণ্যের বুকে ধাক্কা লাগিতে পারে। আমরা বিষয়টি নির্লিপ্ত চোখে দেখিতে চাই। অবশ্যই ঘুষ, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও অন্যান্য অনিয়ম লইয়া আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। এহেন অপরাধ কাহারো কাম্য হইতে পারে না। আমরাও চাই, এই ধরনের অপরাধ হইতে সমাজ রাষ্ট্র যতটা সম্ভব মুক্ত হউক। তবে বাস্তবতা হইল, বিশ্বের প্রতিটি দেশেই কমবেশি ঘুষ-দুর্নীতির অস্তিত্ব দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার অভিশাপ হইতে কেবল তৃতীয় বিশ্বই নহে, ‘প্রথম বিশ্বও’ মুক্ত নহে। মাত্রার ব্যবধান রহিয়াছে মাত্র। আমরা সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব দেখিয়াছি, পুঁজিবাদী সমাজ দেখিয়াছি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখিতেছি। এইসকল ব্যবস্থাতেই ঘুষচর্চা চলিয়াছে, চলিতেছে। ইহা এমনই এক সংক্রামক ব্যাধি যাহা হইতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি খুঁজিয়া পাওয়া দুরূহ। বিশ্ব অর্থনীতির যে জটিল চলন, তাহাতে কোথায়, কোন রাষ্ট্র, কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মধ্যে কখন ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ সম্পর্ক তৈরি হইয়া যাইবে বা যাইবে না তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। আমরা ইহাও দেখিয়াছি, যেই সকল প্রতিষ্ঠান ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, তাহাদেরও অর্থের উেস অস্পষ্টতা রহিয়াছে। রহিয়াছে কর্মকাণ্ড বা বিবৃতি প্রদানে অসংলগ্নতা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, অতি সম্প্রতি দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং তাহার ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানকে ‘লুটেরা’ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল একটি ‘সর্বজনগ্রহণযোগ্য’ প্রতিষ্ঠান। এই বক্তব্যে যাহাকে ইঙ্গিত করা হইয়াছিল বিষয়টি তাহার গায়ে লাগে। ইহার পর মোহন সিরিজের গল্পের মতো ‘কী দিয়া কী হইয়া গেল’! প্রতিষ্ঠানটি ঐ ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানকে ‘শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় ছোটো-বড়ো সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয়’ বলিয়া প্রত্যয়ন করিল। ইহাতে দেশের সচেতন নাগরিকরা বিভ্রান্ত হইল, আমরাও বিব্রত হইলাম। প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রশ্ন থাকিয়া যায়, তাহা হইলে আগে বলিলেন কী? কীসের ভিত্তিতে বলিলেন? একটি প্রতিষ্ঠান যখন দুই চারি দিন না যাইতেই নিজেদের বিবৃতি হইতে সম্পূর্ণ সরিয়া গিয়া বিবৃতি প্রদান করে তখন স্বভাবতই একটি প্রশ্ন আসিয়া সম্মুখে দাঁড়ায় : মাজেজা কী? আমরা বলিতে চাহি না যে কোনো যোগসাজশ তৈরি হইয়াছে, কিন্তু এই ধরনের দৈত ভূমিকায় প্রতিষ্ঠানেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহা নিশ্চিত।
অতএব, ঘুষ-দুর্নীতি রোধে আমাদের সর্বাঙ্গীন চিন্তা করিতে হইবে। বাস্তব পরিস্থিতিকে সামনে রাখিয়া যতটা সম্ভব রাষ্ট্র-সমাজকে পরিচ্ছন্ন করিতে প্রচেষ্টা চালাইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, অতি উত্সাহ কখনো কখনো বিফলতা ডাকিয়া আনে। আমরা সমাজ হইতে ঘুষ-দুর্নীতি-অপরাধ দূর হউক, ইহা মনেপ্রাণে চাই। তবে তাহা বাতাসের গলায় দড়ি দিয়া নহে।