জলবায়ু পরিবর্তন ও পৃথিবীর ভবিষ্যত্

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবীর ভবিষ্যত্ নিয়া রেড অ্যালার্ট জারি করিয়াছে জাতিসংঘের বিজ্ঞানীদের একটি প্যানেল। আইপিসিসি বা জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের বিজ্ঞানীরা তাহাদের এক বিশেষ রিপোর্টে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন যে, মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে এখন দ্রুত হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িতেছে এবং বরফ গলিতেছে। এই কারণে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু তাহাদের আবাসস্থল বদল করিতেছে। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে বরফের আচ্ছাদন বিলীন হইয়া যাইতেছে। ইহাতে বাড়িতেছে কার্বন নিঃসারণের মাত্রা। দেখা যাইতেছে, ইহার আগে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত যেইসব রিপোর্ট ও ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে, এই রিপোর্টে  পরিস্থিতি তাহার চাইতেও ভয়াবহ ও বিপজ্জনক বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এইজন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় রাজনীতিকদের ওপর জনগণের চাপ বাড়াইবার পরামর্শ দেওয়া হইয়াছে।

আইপিসি রিপোর্টটি এমন সময়ে প্রকাশিত হইল, যখন বিশ্বনেতারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউ ইয়র্কে রহিয়াছেন। জলবায়ু পরিবর্তনজিনত নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বনেতারা চুক্তিতে উপনীত হইলেও চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রগতি তেমন নাই বলিলেই চলে। বিজ্ঞানীরা এইজন্যই কি বারংবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া চলিয়াছেন? আইপিসিসির প্রধান রিপোর্ট প্রণেতা  ড. জ্যঁ পিয়েরে গাত্তুসো মনে করেন, বিভিন্ন দিক হইতে ঝুঁকির কারণে ব্লু প্ল্যানেট এখন মহাসংকটে। বিশেষ করিয়া নিচু জায়গাগুলিতে সাগরের উচ্চতা বাড়িবার পরিণতি হইবে মহাভীতিকর। পৃথিবীতে বর্তমানে ৭০ কোটি মানুষ এইরকম নিচু উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। ইহার মধ্যে শুধু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ রহিয়াছে এমন নহে, অনেক উন্নত দেশও ইহার ক্ষতির শিকার হইবে। যেমন—বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে নিউ ইয়র্ক বা সাংহাইয়ের মতো বিত্তশালী নগরগুলোও ঝুঁকিতে পড়িবে। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, সাগরে তাপমাত্রা বাড়িবার ফলে আবহাওয়া যে দিন দিন বিপজ্জনক আচরণ করিতেছে, তাহা সামুদ্রিক ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস বৃদ্ধির মাধ্যমেও উপলব্ধি করা যাইতেছে। একই সঙ্গে প্রাণিকুলের আবাসস্থল পরিবর্তনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিয়াও তাহা স্পষ্ট হইতেছে।

পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ করা হইতেছে, তাহার মধ্যেও অনেকে বিশ্বরাজনীতির গন্ধ পাইতেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলি বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানত শিল্পোন্নত দেশগুলিকে দায়ী করিয়া ক্ষতিপূরণ দাবি করিতেছে। অন্যদিকে উঠতি অর্থনীতির দেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হইবার প্রচেষ্টাকে নিরুত্সাহিত করা হইতেছে। আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমরা সকলেই কমবেশি দায়ী। বলা হয়, দারিদ্র্য নিজেও দূষণ সৃষ্টিকারী। তবে সবচাইতে বড়ো কথা হইল, পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন নূতন কোনো বিষয় নহে। নবি হজরত নূহ (আ)-এর সময় মহাপ্লাবনে গোটা পৃথিবীই ডুবিয়া গিয়াছিল। এইভাবে বড়ো বড়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক বিভিন্ন সময় ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। তাহার পরও আমরা যদি সচেতন হই, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলি চিহিত করিয়া প্রতিহত করি, তাহা হইলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় কম দেখা দিবে।

বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশও। এইজন্য এখানকার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাকে উপদ্রুত এলাকা বলিয়া ঘোষণা করা দরকার। ইহা ছাড়া স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। এইসব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার-পানীয় সরবরাহের পাশাপাশি সুন্দরবন ও তাহার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আবশ্যক।