দেশের উন্নয়নে বহুমাত্রিক ও অনন্য শিল্প পর্যটন

মো. তারিকুল ইসলাম

 

বর্তমান বিশ্বে পর্যটন একটি অপার সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পরিচিত। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও বৃহত্ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে এ শিল্প বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১১ জনের মধ্যে ১ জন বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন পেশার সঙ্গে জড়িত।

বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি,  ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৭০ কোটি।  পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৮৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে। এছাড়াও বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালের মধ্যে এ শিল্প থেকে  ২৯ কোটি ৭০ লাখ লোকেরও বেশি  কর্মসংস্থান হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখবে ১০.৫ ভাগ।  বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা  অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই শিল্পখাতের বিকাশ ঘটে মূলত পঞ্চাশ দশকে এবং ১৯৯৯ সালে পর্যটনকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণপিপাসু মুগ্ধ হয়েছেন। নয়নাভিরাম প্রকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের দেশকে পরিণত করেছে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের তীর্থস্থানে। এখানে রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন; এছাড়াও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। শৈবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, ইনানী সমুদ্রসৈকত, হিমছড়ির ঝরনা, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকনাফ দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো জায়গা। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চলের পাশাপাশি রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানও। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুটিবাড়ি শুধু দেশীয় পর্যটক নয় বরং অনেক বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীর কাছে সমাদৃত।

বর্তমানে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন দেশের একটি হিসেবে ভাবা  হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১০ শতাংশ এই খাত থেকে আয় করা সম্ভব। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০১৩ সালে পর্যটনখাতে ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটনখাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।  পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ ও অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব।

অপার সম্ভাবনাময় এই শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ জরুরি। পর্যটন স্থানগুলোয় উন্নত মানের হোটেল-রেস্টুরেন্টের সংখ্যা যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি উন্নত সেবাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যটনশিল্প সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি  কোর্স চালু করা, যাতে করে দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়