রাজধানীসহ সারা দেশের স্কুলগুলোতে তৈরি হচ্ছে বুলিং গ্রুপ শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এ বুলিং গ্রুপ সক্রিয়। মাদ্রাসা, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন—সব জায়গায় চলছে এ সামাজিক ব্যাধি। এ ব্যাধির কারণে অনেক কোমলমতি শিশুর স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বুলিংয়ের মাধ্যমে এক বা একদল শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করে একধরনের বিকৃত আনন্দে মেতে উঠছে; যা একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সমস্যার বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলভীতি থেকে শুরু করে ঝরে পড়া, এমনকি কখনো আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নিচ্ছে।
গত বছর ৪ ডিসেম্বর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার পর হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি আদেশ দেয়। ‘বুলিং’ ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায় নির্ণয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরির জন্য অতিরিক্ত শিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেয় আদালত। ওই কমিটিকে অরিত্রীর আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। আদালতের ওই আদেশের ধারাবাহিকতায় গঠিত কমিটি একটি খসড়া নীতিমালা করে আদালতে জমা দেয়। অগ্রগতি প্রতিবেদনের ওপর শুনানিতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অভিযোগ বাক্স’ বসানোর অভিমত আসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বাক্সে অভিযোগ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারও চালাতে বলেছে।
‘স্কুল বুলিং নীতিমালা-২০১৯’ এর খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। নতুন খসড়া নীতিমালায় বিদ্যালয়ের মধ্যে যে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস বহন, স্কুলে ফেসবুক ব্যবহার, ছবি তোলা, ভিডিও করা এবং রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য শাস্তির বিধানও করা হয়েছে। এমনকি নিয়ম ভঙ্গ করলে টিসি দিয়ে দেওয়া হবে, এমন বার্তা সবার মাঝে পৌঁছে দেওয়ার কথাও রয়েছে খসড়া নীতিমালায়।
খসড়া নীতিমালায় বুলিংয়ের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—বিদ্যালয় চলাকালে বা বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে বা পরে, শ্রেণিকক্ষে বা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বা বাইরে কোনো শিক্ষার্থী কর্তৃক (এককভাবে বা দলগতভাবে) অন্য কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা, অশালীন বা অপমানজনক নামে ডাকা, অসৌজন্যমূলক আচরণ করা, কোনো বিশেষ শব্দ বারবার ব্যবহার করে উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করা স্কুল বুলিং হিসেবে গণ্য হবে। নীতিমালায় তিন ধরনের বুলিংয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। শারীরিক বুলিং, সামাজিক বুলিং ও মৌখিক বা মানসিক বুলিং।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কাফি। স্কুলে শিক্ষক একদিন তাকে কোনো কারণে শাস্তি হিসেবে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। এরপর থেকে তার সহপাঠীরা কাফিকে ‘কানধরা কাফি’ বলে ডাকতে শুরু করে। কাফি যতই নিষেধ করে, মন খারাপ করে, সহপাঠীরা তার মন খারাপের তোয়াক্কা না করে তাকে ওই নামেই ডাকতে থাকে। একপর্যায়ে কাফি আর স্কুলে যেতে চায় না, সে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিত্সকের পরামর্শে কাফির অভিভাবকরা তার স্কুল বদল করেন।
কাফির মা কামরুন নাহার বলেন, “আমি বুঝতে পারি বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার পর। তার আগে কাফি প্রায় দিন বলত—‘আমি স্কুলে যাবো না’, ‘স্কুলে যেতে আমার ভালো লাগে না’। পরে স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি—কাফি স্কুল বিল্ডিংয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকত। কারণ অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে বুলিং করত। এখন কাফিকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েছি।”
স্কুলের নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কুল শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিটি স্কুলেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হর-হামেশায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করতে দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে স্কুলগুলোতে ধারাবাহিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের কাউন্সিলিং দরকার। নইলে আমরা ইচ্ছে থাকলেও হয়তো কাজ করতে পারব না। কারণ স্কুল কিংবা এলাকার প্রভাবশালী কারো বাচ্চাকে এ ধরনের কোনো বিষয়ে বোঝাতে গেলেই, পরের দিন ফোনে হুমকি আসে। কেন স্কুল কমিটির কিংবা এলাকার প্রভাবশালীর বাচ্চাকে বকা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে স্কুলগুলোতে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর মাধ্যে চার জন লেখাপড়ায় খারাপ করে স্কুল বুলিংয়ের কারণে। কোনো কোনো বাচ্চা আছে যারা অন্যদের উত্ত্যক্ত করে, বিরক্ত করে একধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। এটা যে কারো বাচ্চাই করতে পারে।
স্কুল বুলিং বন্ধে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়কেই সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার বাংলা বা ইংরেজি মিডিয়ামসহ সব স্কুলে এর ব্যাপকতা আছে। আমাদের কাছে মানসিক সমস্যা নিয়ে যে বাচ্চারা আসছে, তাদের বেশির ভাগই স্কুলের সহপাঠী বা সহপাঠীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে বুলিংয়ের শিকার এবং খুব কমসংখ্যক হলেও কেউ কেউ শিক্ষকের দ্বারা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে।’ তিনি করণীয় হিসেবে বলেন, ‘স্কুলগুলোতে মেন্টাল হেলথের ওপর জোর দিতে হবে।’
সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি থেকে শুরু করে ওপরের ক্লাসগুলোতে বুলিং বেশি দেখা যায়। স্কুলের ভেতরেই বুলিং গ্যাংগুলো তৈরি হয়। বুলিং গ্যাং একজনকে টার্গেট করতে পারে এবং তাকে একধরনের মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে মজা পায়। এটা নিয়ে দেশে কোনো গবেষণা হয়নি। তবে এর মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।’