ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়, ‘প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, রোগী ও কর্মীদের কাছে আমরা হার্টের হিরো হতে পারি’—অর্থাত্ আমরা সকলে আমাদের হার্টের সুস্থতার জন্য যা করণীয়, সে কাজগুলো করার এবং ক্ষতিকর কাজগুলো বর্জনের প্রতিজ্ঞা করার মাধ্যমে সকলের কাছে আমরা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি।
মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে হূদিপণ্ড বা হার্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট সুস্থ থাকলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সুস্থ এবং কর্মক্ষম থাকবে। অসংক্রামক রোগ দিন দিন বেড়েই চলছে যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, হূদেরাগ ইত্যাদি। এগুলো সারা বিশ্বেই এক বিরাট স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব অসংক্রামক রোগের মধ্যে স্ট্রোক এবং হূদেরাগ অন্যতম, যেগুলো বিশ্বের উল্লেখযোগ্য মরণব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি লোক এই মরণব্যাধিতে মারা যায়। অনেকেই মনে করেন, হূদেরাগ পুরুষদের বেশি হয়, তা কিন্তু ঠিক নয়। বর্তমান সময়ে নারীরা একই হারে হূদেরাগে আক্রান্ত হন। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু যে কোনো বয়সের মানুষের হূদেরাগ হতে পারে।
একবার আক্রান্ত হয়ে গেলে তা অনেক সময় স্থায়ী রোগ হিসেবেই বিবেচিত হয়, সারাজীবন এই মারাত্মক ব্যাধি পুষতে হয় এবং অনেক ওষুধপত্র খেতে হয়। আবার হূদেরাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিত্সা জটিল ও ব্যয়বহুল এবং দেশের সব জায়গায়, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিত্সার সুযোগ-সুবিধাও দুর্লভ। এমনকি আক্রান্ত হলে হাসপাতালে আনতে আনতেই রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারে। তাই এই রোগ প্রতিরোধ করাই উত্তম। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অল্প বয়সেই হূদেরাগের কারণ হতে পারে। অপরদিকে আগে থেকেই স্বাস্থ্যসচেতন হলে হূদেরাগের আশঙ্কা থাকে অনেক কম। বিভিন্ন কারণে হূদেরাগে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে, যাকে বলা হয় রিস্ক ফ্যাক্টর। কিছু কিছু সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য, আর কিছু অনিয়ন্ত্রণযোগ্য। অনিয়ন্ত্রণযোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো হলো বয়স, লিঙ্গ ও বংশগত। নিয়ন্ত্রণযোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্য, ডায়াবেটিস, মুটিয়ে যাওয়া, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, চর্বি জাতীয় খাদ্য বেশি এবং আঁশ জাতীয় খাদ্য কম খাওয়া, মানসিক চাপ, মদ্যপান, জন্মনিয়ন্ত্রক পিল খাওয়া ইত্যাদি। নিরাময়যোগ্য রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিলেই হূদেরাগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
হূদ্যন্ত্রের অন্যতম প্রধান শত্রু ধূমপান। ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। ধূমপায়ীদের শরীরে তামাকের নানা রকম বিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হূদেরাগ দেখা দিতে পারে। ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য যেমন, জর্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে বর্জন করুন। ধূমপায়ীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন, বাড়িতে তামাকমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে পারলে তা আপনার এবং পরিবারের সকলের হার্ট সুস্থ রাখতে সহায়ক হবে।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নিয়মিত হাঁটুন ও ব্যায়াম করুন। যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হূদ্যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, ফলে অধিক ওজন সম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হূদেরাগ দেখা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে ওষুধ খেয়ে ওজন কমানো বিপজ্জনক। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ওষুধ না খাওয়াই ভালো।
হূদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামের মতো কার্যকর অন্য কোনো পথ নেই। সকাল-সন্ধ্যা হাঁটা চলা, সম্ভব হলে দৌড়ানো, হালকা ব্যায়াম, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদি সহজেই করা সম্ভব। জিমে যেতেই হবে এমন নয়, ঘরেই ব্যায়াম করা যায়। তাও না করতে পারলে প্রতিদিন অবশ্যই হাঁটতে হবে।
কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন, খাসি বা গরুর গোসত, কলিজা, মগজ, গিলা, গুর্দা কম খেতে হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রায়ই চর্বি জাতীয় যেমন, পোলাউ, বিরিয়ানি, মিষ্টি ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি যেমন, সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। রক্তে উচ্চ চর্বি, অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে রক্তনালীর দেওয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং হূদেরাগ দেখা দিতে পারে।
বেশি আঁশযুক্ত খাবার, প্রচুর শাকসবজি ও টাটকা ফলমূল বেশি করে খান। যে কোনো মাছ এমনকি সামুদ্রিক মাছ খাওয়া ভালো। আটার রুটি এবং সুজি জাতীয় খাবার পরিমাণ মতো খাওয়া ভালো। তাজা ফলে প্রচুর আঁশ এবং ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ, এতে ক্যালোরি কম থাকে ও এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বেশি থাকে, সতেজ ও সবল হূদ্যন্ত্রের জন্য যা সহায়ক। তেল-চর্বিতে ভরা ফাস্টফুড এড়িয়ে চলতে হবে।
তরকারিতে প্রয়োজনীয় লবণের বাইরে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে। খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপও বেড়ে যায়, ফলে হূদেরাগ দেখা দিতে পারে। অনেকেই খাবারের সঙ্গে কাঁচা লবণ খান, এটা অবশ্যই বর্জন করতে হবে। আবার ডায়াবেটিস অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের এ্যাথারোসক্লেরোসিস বেশি হয়। ফলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। তাই রোগীদের অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও জীবন যাত্রায় পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
শরীরকে যেমন, সুস্থ রাখতে হবে, তেমনি মনকেও রাখতে হবে সুস্থ। অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ ও হূদেরাগ দেখা দিতে পারে। তাই মানসিক ও শারীরিক চাপ পরিহার করতে হবে, নিয়মিত বিশ্রাম, সময় মতো ঘুমানো, শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দেওয়া, নিজের সখের কাজ করা, খেলাধুলা, আড্ডা, বইপড়া, যোগব্যায়াম ও ধ্যান হতে পারে চাপ মুক্তির উত্তম দাওয়াই। প্রতি রাতে ভালো ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। নিজ ধর্মের চর্চা করার মাধ্যমে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় এবং মন প্রফুল্ল থাকে।
অতিরিক্ত মদ্যপান ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য পরিহার করতে হবে। বেশি এ্যালকোহল গ্রহণ মানে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়া। এতে হূদ্স্পন্দনেও প্রভাব পড়ে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ হার্ট মানেই সুস্থ মানুষ, সুস্থ জীবন। আর সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই হার্ট সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে হূদেরাগের কারণগুলো জেনে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নিজে নয়, পরিবার এবং সমাজের মধ্যেও জনসচেতনমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
n লেখক : ইউ জি সি অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়