সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের একটি ভিডিও চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার ফেসবুকে ‘চ.সি.ক নির্বাচন-২০২০-প্রিয়নেতা আ.জ.ম নাছিরউদ্দীন ভাইয়ের ভক্ত’ নামের একটি গ্রুপে মো. মনিরুল রহমান মনি ও সাচ্চু চৌধুরী নামের দুটি আইডি থেকে এই ভিডিওটি শেয়ার হতে দেখা যায়।
ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সামরিক মহড়ার মতোই হুইপ পুত্র শারুন একে-৪৭ রাইফেল সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ করছেন।
এ বিষয়ে নাজমুল করিম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিও রাশিয়া বিশ্বকাপে শুটিং রেঞ্জে স্পটশট। আমি গত বছর বিশ্বকাপ শেষে রাশিয়াতে একটি শুটিং রেঞ্জে একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে শুটিং করি। আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ হিসেবে একটি মহল এই ভিডিওটি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণ পর রাত ৮টার দিকে হুইপ পুত্র ফেসবুকে তার ভিডিওটির লিংক শেয়ার করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা জাতির বিবেক, দয়া করে কোনো কুচক্রীমহলের ষড়যন্ত্রে আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। বিজয় আমাদের হবেই ইনশাল্লাহ। মেঘ দিয়ে সূর্যকে বেশিক্ষণ ঢেকে রাখা যায় না। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চেপে রাখা যায় না।’ তার শেয়ার করা লিংকে দেখা যায়, ভিডিওটি তিনি গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথমে শেয়ার করেছিলেন।
কয়েক দিন আগে জুয়া, ক্যাসিনো বন্ধে দেশব্যাপী চলমান অভিযান সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের পিতা আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক চৌধুরী। তিনি ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও ক্লাবে তাস খেলার পক্ষে মত দেন। কিন্তু তিনি আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসর বসিয়ে দিনে ছয় লাখ টাকা আয় করেন বলে ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম দাবি করার পর এ নিয়ে দ্বন্দ্ব আরো ঘনীভূত হয়। এর পাশাপাশি জুয়ার আসর থেকে হুইপের বিশাল অঙ্কের আয় নিয়ে ফেসবুকে এক পুলিশ কর্মকর্তার দেওয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে পানি আরো এক দফা ঘোলা হয়। আবাহনী ক্লাবে জুয়ার আসর থেকে গত পাঁচ বছরে হুইপের ১৮০ কোটি টাকা আয় হয়েছে বলে নিজের ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দেন ওই পুলিশ পরিদর্শক। ওই স্ট্যাটাসের পর পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে আবাহনী ক্লাবে জুয়ায় হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এবং হুইপের ছেলের সঙ্গে দিদারুল আলমের টেলিফোনের কথোপকথনের অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়েছে বলে জানা গেছে। দ্বন্দ্ব তৈরির পেছনে তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে দায়ী করেছেন হুইপের ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী (শারুন)। এই তিন নেতা হলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান এবং নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী।
এর আগে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরীকে টেলিফোনে হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন হুইপপুত্র নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। এ ঘটনায় শারুনের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকিসহ কুরুচিপূর্ণ কথা বলার অভিযোগ এনে গত ১৯ সেপ্টেম্বর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন দিদারুল আলম চৌধুরী। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন (দিদারুল আলম) চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। ২০০৭ সালে তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রাখা হয়। সে হিসেবে প্রিমিয়ার ব্যাংক জিইসি মোড় শাখায় ‘চট্টগ্রাম আবাহনী ফুটবল কমিটি’ নামে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়। হিসাবের স্বাক্ষরকারী হিসেবে সব ধরনের লেনদেনে ক্লাবের মহাসচিব শামসুল হক চৌধুরী, ম্যানেজার সাইফুদ্দিনের পাশাপাশি দিদারুল আলমের স্বাক্ষর নেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তাকে অন্ধকারে রেখে ওই হিসাব থেকে টাকা-পয়সা লেনদেন করা হচ্ছিল। সে জন্য দিদারুল এ মাসে অ্যাকাউন্ট বন্ধের আবেদন করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখে। এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে শামসুল হকের ছেলে নাজমুল করিম শারুন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে দিদারুলের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন। কথা বলার একপর্যায়ে বন্ধ হওয়া ব্যাংক হিসাব খুলে দিতে তিনি চাপ দিতে থাকেন। তার দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে প্রবীণ এ ক্রীড়া সংগঠককে হুমকি-ধমকিসহ গালি দেন শারুন।
কী ছিল দিদারুল ও শারুনের কথোপকথনে?
দিদারুল আলম ও শারুনের মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনের একাংশ তুলে ধরা হলো—
শারুন : আর আঙ্কেল আপনি ঐ চিঠিটা উইথড্র করে ফেলবেন। ওটা দরকার নাই।
দিদারুল : ঐটা... ঐটা ক্লাবের বিষয়। ওটা আমি তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব। ওকে।
শারুন : ঐগুলা...ঐগুলা দরকার আছে শুধু শুধু?
দিদারুল : আশ্চর্য কথা এনা। আমার যে...
শারুন : ঐটা দিয়ে কিছু হবে যে না। এটা আপনার প্রতি আমাদের...
দিদারুল : না হইলে মনে করো আমার একটা আপত্তি থাকলে ভবিষ্যতে ...
শারুন : ঠিক আছে আপনার আপত্তি আপনি রাখেন। আমরা এইরকম কতো আপত্তি দিতে পারি না বিভিন্ন জায়গায়...
দিদারুল : ঠিক আছে। তুমি রবিবারে আস।
শারুন : আপত্তি কি এখানে আপনি একা দিতে পারেন নাকি? আপত্তি তো আমরাও দিতে পারি।
দিদারুল : ক্লাবের ব্যাপারে তোমার আব্বার সঙ্গে বসে কথা বলব।
শারুন : ক্লাবের ব্যাপারে কিসের কথা? ক্লাবের ব্যাপারে যা কথা হওয়ার হইছে আর কথা বলার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখাইছেন তো, এখন আমাদেরটা আমরা দেখাব।
দিদারুল : ক্ষমতা-টমতা কিচ্ছু না।
শারুন : দেখাইছেন তো। আপনি ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না?
দিদারুল : আমাদের সেইফের জন্য করতে হবে না?
শারুন : আমরা যদি ক্ষমতা দেখাই আপনি এক শতাংশও টিকতে পারবেন?
দিদারুল : না না, আমি ১০০ শতাংশ টিকতে পারব। আমি হইলাম শেখ মুজিবের আদর্শিক সন্তান।
শারুন : এগুলা... এগুলা আঙ্কেল... এইসব, এইসব, এইসব গালগোল অন্য জায়গায় কইরেন। আমার সঙ্গে কইরেন না। আমি সম্মান দিছি সম্মান নিয়ে থাইকেন।
দিদারুল : শোন আমি সাগরেদ নই। তোমার আব্বা তো জাতীয় পার্টি করে, এখন আওয়ামী লীগে আইসা...
শারুন : এগুলা শেখ হাসিনা বুঝবে। আপনার বোঝার দরকার নাই। রাখেন মিয়া ফালতু।
দিদারুল : আমরা তো শাহজাদা, সাগরেদ না।
শারুন : আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?
দিদারুল : আমি তোমাকে এজন্যই ফোন দিই নাই। তুমি এক কাজ করো রবিবারে আইসা...
শারুন : রাস্তাঘাটে যখন প্যান্ট শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন। বেয়াদবি তো এখনো দেখেন নাই। সম্মান করে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?
দিদারুল : অ্যাঁ অ্যাঁ? তুমি রাস্তাঘাটে!!!
শারুন : আপনি উলটাপালটা কথা বলতেছেন কিসের জন্য?
দিদারুল : উলটাপালটা কী বললাম? আরে শোনো তোমার বাবা বিএনপি-যুবদলে এরপর জাতীয় পার্টি কইরা এখন—
শারুন : গালবাজি যেডে এডে গরিবি রাস্তাঘাটত চোয়ারাই গালর দাঁত বেয়াগ্গুন ফেলাই দিইয়ুম। বেয়াদব হডিয়ার! (গালবাজি যেখানে সেখানে করবি রাস্তাঘাটে চড় মেরে মুখের দাঁত সবগুলো ফেলে দেব। বেয়াদব কোথাকার!)
দিদারুল :এরপরে জাতীয় পার্টি গরি।
শারুন : এই মিয়া তোরে রাস্তাত ধরি পিডিব মাইনস্যে। বেয়াদব! তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? এই তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ? (এই মিয়া তোকে রাস্তায় ধরে পেটাবে মানুষ। বেয়াদব! তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? এই তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস? তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)
দিদারুল : আমি তো অর্জিনাল।
শারুন : তোরে আঁই ফোন দিতো হয়িলাম না? তুই আঁরে ফোন কিল্লাই দিয়ছ দে? (তোকে আমি ফোন দিতে বলেছিলাম? তুই আমাকে ফোন কেন দিয়েছিস?)
দিদারুল : এই দেখ না তোমার বেসিক, যেটা সেটা তুমি উলটাপালটা, এটাই তো তোমাদের বেসিক।
শারুন : তুমি আমারে ফোন দিছ কেন? ফালতু কোথাকার। আমার বাপে যেটা করবে করুক না। আমার বাবা হুইপ। আর তুমি এসব গালবাজি করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেছো।
দিদারুল : রাস্তাঘাটে তুই প্যান্ট খুলিবিদে ব্যাডা! (রাস্তাঘাটে তুমি প্যান্ট খুলবে ব্যাটা!)
শারুন : আমি খুলব না। মানুষজনে খুলবে যে।