অবশেষে ক্যাম্পাস ছাড়লেন বশেমুরবিপ্রবি ভিসি

বৈরী আবহাওয়া ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা ১১ দিন ধরে ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অব্যাহত আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এমনই এক প্রেক্ষাপটে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গতকাল রাত ৯টার দিকে পুলিশের পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়েন ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। এ খবর শুনে শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। এদিকে নানা অভিযোগের কারণে ভিসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গঠিত তদন্ত কমিটি।

গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এ সময় গত ২১ সেপ্টেম্বর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।  তখন তারা বলেন, ভিসির পতন না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি চলবে। সংবাদ সম্মেলন শেষে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা চত্বরে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধন করেন। তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, ‘আমরা তদন্তে তেমন কোনো সাক্ষী-প্রমাণ বা হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারিনি। ফলে এ বিষয়ে একটি ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. নূরউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করতে গেলে পুলিশ জানায়, এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি মামলা হয়েছে, তাই আর মামলার দরকার নেই। সদর থানার এসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার বিষয়ে অজ্ঞাতনামা ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমরা মামলার বিষয়ে তদন্ত করছি।’ প্রসঙ্গত, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলন, অবৈধ ভর্তি, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক স্খলনের দায়ে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি।  ইউজিসির তদন্ত কমিটি এ-সংক্রান্ত রিপোর্টে তাকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসমূহের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ একাধিক সুপারিশ করে। গতকাল রবিবার ইউজিসির পাঁচ সদস্যের এই কমিটি প্রতিবেদনটি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহর  কাছে জমা দেয়। সেটি গতকালই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো  হয়।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য ও ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করেছি। ভিসি, শিক্ষার্থী, গ্রামবাসীসহ সবার সঙ্গে কথা বলে সে আলোকেই রিপোর্ট জমা দিয়েছি। আমি মনে করি, এ বিষয়ে সুষ্ঠু একটা সমাধান হবে।’

সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে বলা হয়ছে, ভিসি খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে স্বপদে বহাল রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তাকে  প্রত্যাহারের সুপারিশ করে বলা হয়, অনিয়ম-দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর ইউজিসির তদন্ত দল বশেমুরবিপ্রবিতে অবস্থান করে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে ১৯ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে নানা অভিযোগের সত্যতা পান বলে জানা যায়।

যত অভিযোগ :বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়া নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের অধিকাংশই হয়েছে বর্তমান উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের মেয়াদে। ২০১৫ সাল থেকে তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে এমএলএসএস পদে নিয়োগ, বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি বা সমমানের পাশ বলা হলেও অষ্টম শ্রেণি পাশ প্রার্থীদেরও নিয়োগ, বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ বা জিপিএ-২.৫০ পাওয়া প্রার্থীদের নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময় ব্যয় না হওয়া প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাত্, নিজের আত্মীয়কে নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিউটি পার্লার খোলা, নারী কর্মচারীকে যৌন হয়রানি, কেনাকাটায় অনিয়ম, ভর্তি পরীক্ষায় পাশ না করা শিক্ষার্থীদেরও ভিসি কোটায় ভর্তিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করারও অভিযোগ আছে।