নাসরীন মুস্তাফা
কানকাটা ভ্যান গখ ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমাস্টারডামে, বুড়ি তুঁসোর জাদুঘরে ঠাঁই দাঁড়িয়েছিলেন। মোমের মূর্তি ভেবে কথাটথা বলিনি। সেই অভিমানে আমাস্টারডামেই ভ্যান গখ জাদুঘরে দেখা হলেও কথা বললেন না। মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নিজের আঁকা সূর্যমুখীর মাঠের সামনে। চিনতে কষ্ট হলো না বলেই তাজ্জব হলাম খুব। পিঠে টোকা মেরে এক্সক্যুজ মি বলতেই ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন, কানাকাটা বলে কি দাম নেই ভেবেছ?
তা কেন...তা কেন...আমার এরকম তোতলামিতে ফিরে তাকালেও আমার চোখ তার কোন্ কান কাটা, তা-ই খুঁজতে ব্যস্ত বুঝে ভ্রু কুঁচকে যেতে দেখলাম। মেঘলা স্বরে বললেন, কেউ আমাকে ভালোবাসেনি। কেউ না। কেন জান? আমি দেখতে কুিসত। ভেবেছিলাম, যার কোনো উপায় নেই, এমন কেউ আমাতে উপায় খুঁজে নেবে নিশ্চয়ই। প্রতিযোগিতাহীন বাজারে চাহিদা বানাতে প্রেম চেয়েছিলাম যার, সে নারী শরীর বেচে। কিন্তু জানো, সেও ভালোবাসেনি।
ভেজা চোখে ভরা পুকুরের টলমল ভাব দেখে খুব মায়া হয়। বলি, আহা! বেচারা! যা আঁকতেন, তা-ও তো কেউ কেনেনি।
জানো তো তুমি। এও কি জানো, কপালে রিভালভার ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে মরে যখন গেলাম, তখন আমার বয়স মাত্তর সাঁইত্রিশ?
জানি।
অথচ দেখ, জাদুঘরে আমার মোমের মূর্তি! লোকে টিকিট কেটে দেখছে। আমার কপাল ফুটো করে দিল গুলি, সেই ফুটো নেই মূর্তিটার। মোমঘষা চেহারা নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকে। কাটা কান নকল চুল দিয়ে ঢাকা। বাণিজ্য হচ্ছে বটে খুব!
সান্ত্বনা দিতে চেয়ে বলি, দিন কি কারো চিরকাল একরকম থাকে? আপনার ছবি নিয়ে এখন কত হৈচৈ, জানেন তো?
আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটায় সানফ্লাওয়ার ছবিটা দেখলেন। জাদুঘরের পাশে খুলে বসা দোকান থেকে কিনেছি একটু আগেই। ওখানে ছাতা, টি শার্ট, চাবির রিং, এরকম কত কিছু যে আছে। এক একটায় তার আঁকা এক একটা ছবি বসানো। খুব কিনছে লোকে।
ব্যাগের দিকে তাকিয়ে কী যে কী হলো! টলমল পুকুরে ঢেউ ওঠে যেন। গাল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রু মুছতে টিস্যু পেপারের প্যাকেট এগিয়ে দেই। প্যাকেটের গায়ে সেই চিত্রকলা, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘তারাভরা রাত’। এক্সক্যুজ মি বলে কেন যে চলে গেলেন পাশের ঘরে, বুঝলাম না। দু’ মিনিট পরেই ফিরে এলেন যখন, তখন দেখি ডান গাল ভেসে যাচ্ছে রক্তে। প্যাকেট থেকে টিস্যু নিয়ে রক্ত মুছতে লাগলেন। তাতে সরে যায় চুল। বুঝলাম, ডান কানটাও কেটে ফেলেছেন এইমাত্র। বুঝলাম, এর আগে কেটেছিলেন বাম কানখান।
দুই কানকাটা ভ্যান গখ বিড়বিড় করে বললেন, আশা করি রেট আরো বাড়বে। কী বল, বাড়বে না?
উত্তরে আমি যে কী বলেছিলাম, এখন আর তা মনে পড়ছে না ছাই। আদৌ কিছু বলেছিলাম কি না, তাও যে মনে নেই। বয়স হচ্ছে আমার, তাই না?